
সিরাজুল ইসলাম : আশ আশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের লক্ষ্মীখোলা গ্রামের ঘেরের পাড়ে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল জয়ন্ত কুমার গাইনের সঙ্গে। মে মাসের তীব্র রোদে ঘেরের পানি সামান্য দুলছে। সেই পানির দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে জয়ন্ত বললেন, “কয়েক বছর ধইরা বাগদা চাষ কইরা খালি লোকসান গুনছি। ভাইরাসে সব শেষ হয়া যাইত। এবার মৎস্য অফিসের বুদ্ধিতে ২০ জন মিলে ‘গলদা ক্লাস্টার’ করলাম। গতানুগতিক পদ্ধতির চেয়ে দ্বিগুণ মাছ পাইছি এবার।”
শুধু জয়ন্ত গাইন নন, সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ উপকূল জুড়ে এখন প্রথাগত বাগদা চিংড়ির বদলে মিষ্টি পানির গলদা চিংড়ি চাষের এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা, ভালো দাম এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকির কারণে জেলার প্রান্তিক চাষি থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তারা এখন গলদা চাষে ঝুঁকছেন।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলার সাতটি উপজেলায় ২০ হাজার হেক্টর পরিমাণ ঘেরে গলদা চিংড়ির চাষ হয়েছে, যা গত মৌসুমের তুলনায় প্রায় দুই হাজার হেক্টর বেশি। এই বিশাল পরিধির ঘের থেকে এবার রেকর্ড ১১ হাজার মেট্রিক টন গলদা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
একসময় সাতক্ষীরার ‘সাদা সোনা’ বলতে বাগদা চিংড়িকেই বোঝানো হতো। জেলায় প্রতি বছর প্রায় ৫৫ হাজার ঘেরে বাগদা চাষ হলেও বিগত কয়েক বছর ধরে জলবায়ু পরিবর্তন, তীব্র দাবদাহ এবং ভাইরাসের মড়কের কারণে চাষিরা বারবার পুঁজি হারিয়েছেন। দেবহাটা উপজেলার চাষি আব্দুর রহিম তিন বছর ধরে পর পর লোকসান করে যখন ব্যাংকের ঋণের বোঝায় পিষ্ট, ঠিক তখনই এলাকার চাষিরা পথ খুঁজে পান গলদায়।
চাষিরা জানান, বাগদা লোনা পানির ফসল হলেও গলদা মূলত মিষ্টি বা মৃদু লোনা পানিতে ভালো বাড়ে। পুকুর, ডোবা, বিল বা ধানক্ষেতের মিষ্টি পানিতেও গলদা চাষ সম্ভব। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মাছখোলা গ্রামের চাষি নজরুল ইসলাম এবার ৮০ বিঘা জমিতে গলদা চাষ করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, “গত বছর ৬০ বিঘা ঘেরে ১৪-১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে সব খরচ বাদে ২৫ লাখ টাকা নিট লাভ হয়েছিল। বাগদার মতো গলদায় ভাইরাসের ভয় নাই, গ্রোথও ভালো। তাই এবার চাষ আরও বাড়াইছি।”
চিংড়ি চাষের এই ক্রান্তিকালে সনাতন পদ্ধতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিজ্ঞানসম্মত ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে গলদা চাষের এক নতুন মডেল তৈরি করেছেন তরুণ উদ্যোক্তা হাফিজুর রহমান মাসুম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে প্রথাগত সরকারি বা করপোরেট চাকরির পেছনে ছোটেননি মাসুম। ফিরে এসেছেন নিজ এলাকা দেবহাটার হিরারচকে।
“অনেকের ধারণা চিংড়ি মানেই লোনা পানি, যা একদম সত্যি নয়। গলদা বাড়ে মিষ্টি পানিতে,” মাসুম ব্যাখ্যা করেন। “আরেকটা বিষয় হলো, স্ত্রী গলদার ডিম আসার পর বৃদ্ধি থেমে যায়, কিন্তু পুরুষ গলদা ওজনে ১৫০ থেকে ২৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। তাই আমরা হ্যাচারিতে উৎপাদিত শুধু পুরুষ গলদার রেণু (All Male) চাষ করছি।”
মাসুমের ঘেরে কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ অর্গানিক বা ‘গ্যাপ’ (Good Aquaculture Practice) পদ্ধতিতে প্রোবায়োটিক এবং চালের কুঁড়ো গেঁজিয়ে (ফার্মেন্টেড রাইস ব্রান) প্রাকৃতিক খাবার তৈরি করা হয়।
সরকারি উদ্যোগে সনাতন পদ্ধতি থেকে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষিদের রূপান্তর করতে বাংলাদেশ মৎস্য বিভাগের ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্ট’-এর আওতায় আশাশুনির লক্ষ্মীখোলায় ২০ একর জমিতে একটি পাইলট প্রকল্প শুরু হয়েছে। ২০ জন চাষিকে নিয়ে গঠিত এই ক্লাস্টারে মাছের পাশাপাশি ঘেরের বেড়িবাঁধের ওপর লাউ, টমেটো, ফুলকপি ও শিমের মতো শীতকালীন সবজি চাষ হচ্ছে।
তবে ক্লাস্টার কমিটির সদস্য আজারুল ইসলাম মন্টু কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রথম বছরেই পুকুর খননসহ সব বড় খরচ করতে হয়। অথচ প্রজেক্টের মেয়াদ মাত্র এক বছর। এটা ২-৩ বছর করা হলে এলাকার সব চাষি উপকৃত হতো।”
প্রধান বাধা যেখানে: রেণু সংকট ও চড়া দাম
গলদা চিংড়ির এই অমিত সম্ভাবনার মুখে প্রধান প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে রেণু পোনার তীব্র সংকট। সরকারি নিয়মে নদী বা সুন্দরবনের মোহনা থেকে প্রাকৃতিক রেণু ধরা নিষিদ্ধ। ফলে চাষিদের সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হয় হ্যাচারির ওপর। কিন্তু চাহিদার তুলনায় দেশে হ্যাচারির সংখ্যা অত্যন্ত কম।
চাষি ও উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, সরবরাহ কম থাকার সুযোগে বেসরকারি হ্যাচারি কোম্পানিগুলো সিন্ডিকেট করে একেকটি রেণুর দাম ৪ থেকে সাড়ে ৪ টাকা পর্যন্ত রাখছে। যেখানে এই দাম ২ টাকার মধ্যে হওয়া উচিত ছিল। এই সংকটের কারণে অনেকে অবৈধ উপায়ে ভারত থেকে নিম্নমানের পোনা নিয়ে আসছেন, যা সামগ্রিক মৎস্য খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশ চিংড়ি চাষি সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম বাবলা বলেন, “রপ্তানি বাজারে বাগদার চেয়ে গলদার ভবিষ্যৎ এখন অনেক উজ্জ্বল। কিন্তু সরকার যদি জরুরি ভিত্তিতে মানসম্মত রেণু উৎপাদনের জন্য সরকারি হ্যাচারি স্থাপন না করে, তবে পোনা সংকটে এই সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতে পারে।”
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জিএম সেলিম বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের গলদা চিংড়ির সুনাম নতুন করে ফিরতে শুরু করেছে। বাগদার তুলনায় এটি অত্যন্ত নিরাপদ ও লাভজনক। আমরা প্রান্তিক চাষিদের সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি। সামনে চৈত্র মাসের তীব্র গরমের কথা মাথায় রেখে আমরা চাষিদের ঘেরের গভীরতা কমপক্ষে ৬ ফুট করার পরামর্শ দিচ্ছি, যেন পানির তাপমাত্রা ঠিক থাকে।”
তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন, রেণু পোনার সংকট কাটাতে সরকারি পর্যায়ে নীতিগত আলোচনা চলছে এবং আগামী দিনগুলোতে সাতক্ষীরার এই সাদা সোনা দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখবে।
