বর্ষায় সরগরম সাতক্ষীরার নৌকা পল্লী: দিনরাত ব্যস্ত কারিগররা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৭ দিন আগে

সাতক্ষীরা | নিজস্ব প্রতিবেদক : খটখট শব্দ, হাতুড়ির পিটুনি আর কাঠের ওপর করাতের অদম্য টান—সব মিলিয়ে এখন কর্মচঞ্চল সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা। বর্ষা মৌসুম আর অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণে সাতক্ষীরার এই নৌকা পল্লীতে এখন দম ফেলার সময় নেই কারিগরদের। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।

খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের পাশে পাটকেলঘাটা বলফিল্ড মোড় থেকে পেট্রলপাম্প পর্যন্ত এলাকাটি এখন নৌকা তৈরির বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে প্রায় ২০টির মতো ছোট-বড় কারখানা গড়ে উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, বৈশাখ থেকে শ্রাবণ মাস পর্যন্ত এ ব্যবসায় সবচেয়ে বেশি জমজমাট থাকে।

কেন এই বাড়তি চাহিদা? কারখানার মালিক ও কারিগরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এ বছর অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে নৌকার চাহিদা অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে মৎস্যঘেরের মালিক, কৃষিজীবী ও জলাবদ্ধ অঞ্চলের মানুষ এখন চলাচলের মাধ্যম হিসেবে নৌকার ওপরই নির্ভরশীল।

মেসার্স ঐশী নৌকা কারখানার মালিক শেখ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সাথে যুক্ত আছি। এ বছর জলাবদ্ধতা বাড়ায় দূরদূরান্ত থেকে অনেক ক্রেতা নৌকা কিনতে আসছেন। তাদের চাহিদা অনুযায়ী নৌকা সরবরাহ করতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

কাঠের প্রকারভেদ ও মূল্য নৌকা তৈরিতে সাধারণত মেহগনি, খৈ, চম্বল, লম্বু ও পুঁই কাঠ ব্যবহার করা হয়। কারিগররা জানান, এসব কাঠ দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকলেও সহজে নষ্ট হয় না। বর্তমানে আকারভেদে প্রতিটি ছোট ডিঙি নৌকা তৈরি করতে ২ দিন এবং বড় ট্রলার তৈরি করতে প্রায় এক মাস পর্যন্ত সময় লাগে। সাধারণ ডিঙি থেকে শুরু করে ৪৫ হাত লম্বা ইঞ্জিনচালিত ট্রলার—সবই তৈরি হচ্ছে এখানে। আকার ও প্রকারভেদে এসব নৌকার দাম ২ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১৭-১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা শিল্পটির উজ্জ্বল দিক থাকলেও কিছু সীমাবদ্ধতার কথা জানালেন ব্যবসায়ীরা। কারিগর ইমন বলেন, ‘কাঠ, পেরেক ও আলকাতরার দাম আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। কারখানা ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মিটিয়ে লাভের পরিমাণ এখন বেশ সীমিত।’

আবার শ্যামনগরের জেলেদের জন্য সামুদ্রিক নৌকা তৈরির কাজও চলছে নিপুণ কারুকাজে। তবে সুন্দরবনে জলদস্যুতার আতঙ্কে অনেক জেলে নতুন নৌকা কিনতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন কারিগর শেখ রানা আলী।

অন্যদিকে, বিসিক সাতক্ষীরার উপব্যবস্থাপক গৌরব দাস বলেন, ‘নৌকা তৈরি কুটির শিল্পের আওতায় পড়ে। কারিগররা যোগাযোগ করলে বিসিকের পক্ষ থেকে তাদের ঋণসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।’

ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ নব্বইয়ের দশকের পর যান্ত্রিক যানবাহনের আধিক্যে নৌকা শিল্পের কদর কিছুটা কমে গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যা ও জলাবদ্ধতা বাড়ায় নৌকা আবার যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠছে। তালা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার ও নৌ-কমান্ডো মো. মফিজ উদ্দীন বলেন, ‘নৌকা আমাদের লোকশিল্পের অংশ। আজ প্রতিকূল পরিবেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই নৌকা শিল্পই নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।’

বর্তমানে সাতক্ষীরা থেকে নৌকা যাচ্ছে খুলনা, বাগেরহাট, রূপসা, পাইকগাছা, কয়রা, ঝিনাইদহ, মাদারীপুর ও শরিয়তপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। স্থানীয় চাহিদাও ছাড়িয়ে এই নৌকা এখন দেশের সীমানা ছাপিয়ে সীমান্তবর্তী এলাকায়ও সুনাম কুড়াচ্ছে।