

দেশজুড়ে বাড়ছে বজ্রপাত; বাড়ছে মৃত্যুও, রক্ষাকবচ হয়ে উঠতে পারে তালগাছ
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বনভূমি উজাড়ের কারণে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে বজ্রপাতের ঘটনা এবং এর ফলে প্রাণহানি। এমন অবস্থায় বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক উপায়ে বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকরী একটি উপাদান হতে পারে তালগাছ।
সরকারি হিসাব বলছে, ২০১১ সাল থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে বজ্রপাতে মারা গেছেন অন্তত ৪,১৮৫ জন। ২০২১ সালেই বজ্রপাতে প্রাণ হারান ৩৬২ জন। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় হাওড় ও বিল অঞ্চলে, যেখানে খোলা মাঠে কাজ করা কৃষকরাই প্রধান শিকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তালগাছের উচ্চতা, কাঠামো এবং বাকলের পুরু কার্বনের স্তর বজ্রপাতের আঘাত মাটি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এ কারণে তালগাছকে প্রাকৃতিক 'লাইটনিং কন্ডাক্টর' বলেও অভিহিত করা হচ্ছে।
সরকারি উদ্যোগ ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম
২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সারা দেশে রাস্তার পাশে তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ‘কাবিখা’ ও ‘টিআর’ প্রকল্পের আওতায় বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় শুরু হয় তালবীজ রোপণ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় ৩১ লাখ ৬৪ হাজার তালবীজ রোপণ করা হয়েছে।
সম্প্রতি পটুয়াখালীর বাউফলে 'ইউনিয়ন ফর সেক্রিফাইস অ্যান্ড হিউম্যান এইড' নামের একটি মানবিক সংগঠন ১০ হাজার তালের বীজ রোপণ করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে অনুষ্ঠিত হয়েছে একাধিক আলোচনা সভাও।
তালগাছের বহু রকম উপকারিতা
তালগাছ শুধু বজ্রপাত প্রতিরোধই করে না, একই সঙ্গে এটি ভূমিক্ষয় রোধ, বৃষ্টিপাত বাড়ানো, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে বাড়িঘর রক্ষায়ও সহায়ক। তাল দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের খাবার, যেমন—তালের পিঠা, পায়েস, গুড় ইত্যাদি। তালপাতা ব্যবহার হয় ঘর তৈরিতে, বাবুই পাখির বাসা গড়তে এবং পাখা তৈরিতে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বজ্রপাত বিশেষজ্ঞ নাঈম ওয়ারা বলেন, “আগে মাঠে তালগাছ বেশি ছিল। এখন গাছ কাটা হচ্ছে, রোপণ হচ্ছে না। তালগাছ বজ্রপাত ঠেকানোর প্রাকৃতিক উপায়। প্রতিটি বাড়িতে এবং খোলামাঠে গাছ লাগাতে হবে।”
অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১৩ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বজ্রপাতে মারা গেছেন ১,৮৭৮ জন; তাদের ৭২ শতাংশই ছিলেন কৃষক।
প্রযুক্তি না প্রাকৃতিক উপায়?
বজ্রপাত থেকে রক্ষায় উন্নত বিশ্বে ব্যবহৃত হয় ‘লাইটনিং অ্যারেস্টার’। বাংলাদেশেও সরকারের পক্ষ থেকে ১,২৩২ কোটি টাকার বাজেটে ১৫টি জেলায় ১৩৫টি উপজেলায় বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
তবে এই উদ্যোগ সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা তাল, নারকেল, সুপারি প্রভৃতি লম্বা গাছ লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন।
উপসংহার
বজ্রপাত এখন শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের জন্য আতঙ্ক হয়ে উঠেছে। তবে এ থেকে বাঁচতে প্রকৃতি দিয়েই প্রকৃতিকে রক্ষা করা সম্ভব। বেশি বেশি তালগাছ লাগিয়ে শুধু বজ্রপাত প্রতিরোধ নয়, একই সঙ্গে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা যাবে।
প্রধান কার্যালয়ঃ মহা সি.এন.জি ভবন সংলগ্ন (৪র্থ তলা), ঢাকা- ময়মনসিংহ রোড, মাওনা চৌরাস্তা, শ্রীপুর, গাজীপুর।
মোবাইলঃ ০১৫৩১-১৭২৭৫০ , ইমেইলঃ dbhorerpatrika.com
ওয়েবসাইটঃ www.bhorerpatrika.com বিজ্ঞাপনঃ ০১৩০৫-৯৫০৬২৫ ইমেইলঃ info@bhorerpatrika.com