
নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরা শহরের একটি নামী কলেজের স্নাতক পড়ুয়া এক ছাত্রীর পড়ার টেবিলের ড্রয়ার থেকে সম্প্রতি কয়েক শ ওষুধের খালি পাতা উদ্ধার করেন তাঁর মা-বাবা। চিকিৎসকের কোনো প্রেসক্রিপশন (ব্যবস্থাপত্র) ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে এই তরুণী নিয়মিত সেবন করছিলেন তীব্র মাত্রার ঘুমের ও ব্যথানাশক ট্যাবলেট। মা-বাবা বাধা দিতে গেলে উল্টো আত্মহত্যার হুমকি দিচ্ছে সন্তান। শুধু এই পরিবারটিই নয়, সাতক্ষীরার বহু অভিভাবক এখন তাঁদের সন্তানদের এমন আচরণ ও ভয়াবহ আসক্তি নিয়ে চরম উদ্বেগ আর আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘুমের ও ব্যথানাশক ট্যাবলেট বিক্রির ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সাতক্ষীরার ফার্মেসিগুলো তা মানছে না। ফলে সহজেই এসব ওষুধ চলে যাচ্ছে কলেজপড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে, যা তাদের ঠেলে দিচ্ছে এক অন্ধকার ও আত্মঘাতী নেশার জগতে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আনাচ-কানাচে খালি পাতা
সাতক্ষীরা শহরের পাঁচটি বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘিরে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে, ক্যাম্পাসগুলোর নির্জন স্থান ও বর্জ্য ফেলার জায়গায় বিপুল পরিমাণে এসব ট্যাবলেটের খালি পাতা পড়ে থাকতে দেখা যায়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিষয়টি নিশ্চিত করলেও আসক্ত শিক্ষার্থীদের দাবি, নেশার জন্য নয়; বরং পড়াশোনার চাপ, অনিদ্রা ও শারীরিক ক্লান্তি দূর করতেই তারা এসব ওষুধ খাচ্ছে।
উদ্ধার হওয়া ওষুধের পাতাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা মূলত ছয় ধরনের ওষুধ নেশার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে। এর মধ্যে রয়েছে—মাইলাম ৭.৫, সিন্টা ৫০, পেন্টাডল ৫০, ডর্মিকাম ৭.৫, ডিসোপান ২ এবং ট্যাপেন্টাডল ৫০। ভুক্তভোগী অভিভাবকেরা এসব খালি পাতা নিয়ে প্রতিকারের আশায় সাতক্ষীরা পুলিশ সুপারের দপ্তরেও হাজির হয়েছেন।
তরুণীদের মধ্যে প্রবণতা বেশি, ঝুঁকিতে মেসের শিক্ষার্থীরা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, সিটি কলেজ, দিবা-নৈশ কলেজ এবং সরকারি পলিটেকনিক কলেজে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে ছাত্রীদের মধ্যে এই ধরনের ওষুধ সেবনের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
বিশেষ করে যাঁরা প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসে জেলা শহরে ছাত্রীবাস (মেস) বা ভাড়া বাসায় থেকে পড়াশোনা করছেন, তাঁদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি লক্ষণীয়। অভিভাবকের নজরদারির বাইরে থাকায় এবং রাতে ঘুম না হওয়ার অজুহাতে তাঁরা পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে এসব ওষুধ কিনছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাত্রীরা দলবদ্ধ হয়ে একসাথে দিনে ৭ থেকে ৮টি পর্যন্ত উচ্চমাত্রার ট্যাবলেট সেবন করছেন বলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, "বাসায় সবার সামনেই মেয়ে এসব ওষুধ খাচ্ছে। বাধা দিলে চরম উগ্র আচরণ করে, আত্মঘাতী হয়ে ওঠার হুমকি দেয়। চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না, কারণ ওষুধগুলো বাজারে খুব সহজেই পাওয়া যায়।"
চিকিৎসকেরা যা বলছেন দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ সেবনের ক্ষতিকর দিক নিয়ে কথা হয় সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালামের সাথে। তিনি প্রতিবেদককে বলেন, "এসব ওষুধ মূলত অনিদ্রা, তীব্র ব্যথা ও শারীরিক উপশমের জন্য সাময়িকভাবে দেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এবং অতিরিক্ত মাত্রায় এগুলো সেবন করলে তা স্নায়ুতন্ত্রকে নিস্তেজ করে দেয়। এটি শারীরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে রোগীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে।"
প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, "ফার্মেসিগুলোর ওপর আমাদের কঠোর ও সরাসরি নজরদারি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।"
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ আশরাফুল আলম বলেন, "রেজিস্টার্ড এমবিবিএস ডাক্তারের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ও ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক এবং ঘুমের ওষুধ বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।"
তিনি আরও জানান, "যেসব ওষুধ ব্যবসায়ী বা ফার্মেসি মালিক অতি মুনাফার লোভে তরুণ প্রজন্মের হাতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া এসব ড্রাগ তুলে দিচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলার প্রতিটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুতই মাঠে নামবে পুলিশ।"
প্রধান কার্যালয়ঃ মহা সি.এন.জি ভবন সংলগ্ন (৪র্থ তলা), ঢাকা- ময়মনসিংহ রোড, মাওনা চৌরাস্তা, শ্রীপুর, গাজীপুর।
মোবাইলঃ ০১৫৩১-১৭২৭৫০ , ইমেইলঃ dbhorerpatrika.com
ওয়েবসাইটঃ www.bhorerpatrika.com বিজ্ঞাপনঃ ০১৩০৫-৯৫০৬২৫ ইমেইলঃ info@bhorerpatrika.com