

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) বহিষ্কৃত কিছু নেতার বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার বন্ধ করার ভয়ানক অপতৎপরতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেই অভিযোগে এ চক্রের মূল হোতা হিসেবে বায়রার যুগ্ম মহাসচিব ফকরুল ইসলামের নাম উঠে এসেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আগামী ২১-২২ মে বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়ার মধ্যে নিরাপদ অভিবাসন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণসহ মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার সম্পর্কিত তৃতীয় ওয়ার্কিং গ্রুপের সভা অনুষ্ঠিত হবে। এই সভার আগেই অভিযুক্ত ফকরুল ইসলাম নানা অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। তার লক্ষ্য দেশের রেমিট্যান্স শাটডাউন করে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ব্যর্থ ও অকার্যকর করা। এর ফলে মালয়েশিয়ায় আগামী ৬ বছরে প্রায় ১২ লাখ শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে অনিশ্চিয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে বাংলাদেশের বছরে কয়েক বিলিয়ন রাজস্ব হারানোর শঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জানা গেছে, জনশক্তি রপ্তানী খাতকে বিতর্কিত করতে সম্প্রতি ফকরুলের নেতৃত্বে নিউ ইস্কাটন রোডে বায়রার অফিসে হামলা ভাঙচুর চলানো হয়। বায়রা অফিস থেকে পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত ২০ এপ্রিল দুপুর ২টা ১০ মিনিট নাগাদ দুর্বৃত্তরা বায়রা অফিসে হামলা করে। তারা সভাপতি ও মহাসচিবের কক্ষের নেমপ্লেট খুলে নেয় এবং আসবাব ভাঙচুর করে ও কিছু কিছু আসবাবপত্র লুট করে নিয়ে যায়। ওই হামলা ও ভাঙচুরে নেতৃত্ব দেন বায়রার বহিষ্কৃত যুগ্ম মহাসচিব এবং হিউম্যান রিসোর্স লিমিটেডের ম্যানেজিং পার্টনার ফকরুল ইসলাম।
এর আগে ফকরুলের অপতৎপরতা নিয়ে পল্টন থানায় সাধারণ ডায়েরী করেন এসএফ গ্লোবাল লিমিটেডের এমডি হাওলাদার ফোরকান উদ্দিন। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের এআএল-৪৫২। বারিধারা জে ব্লকের ৮ নম্বর সড়কের ১০ বাড়িতে থাকা এই প্রতিষ্ঠানের মালিক মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম ফ্যাসিবাদী সরকারের একজন দোসর। তিনিসহ আরও কয়েকজন ছাত্র-জনতার গণঅভূত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর দেশের জনশক্তি রপ্তানীখাতকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে আসছেন। তার ধারাবাহিকতায় ফখরুল ইসলাম মালয়েশিয়ান তিন জন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তাদের তিন জনই জনশক্তি আমদানী-রপ্তানী ব্যবসায় জড়িত। তাদের গোপনে মালেশিয়ান সরকারী প্রতিনিধি সাজিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে ওই ব্যক্তিদের সরকারী সংস্থার কর্মকর্তা পরিচয় দেন।
বাদী আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে মালেশিয়া শ্রম বাজারকে বাধাগ্রস্ত এবং বর্তমান অন্তবর্তীকালিন সরকারকে বৈদেশিক শ্রম বাজারে অস্থিরতায় ফেলতে ফখরুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ফখরুলকে সিন্ডিকেটের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করে একটি অভিযোগ জমা হয়েছে। ওই অভিযোগে বলা হয়- পতিত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ বাণিজ্যে ১০ সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী ছিলেন ফকরুল ইসলাম। মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাণিজ্যের জন্য বাগিয়ে নিয়েছেন নিজের মেডিক্যাল সেন্টার ওয়েলকাম মেডিক্যাল। প্রায় ৭০ হাজার কর্মীর নামমাত্র স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। পরে তিনি পরিচয় লুকিয়ে নিজেকে নিরপেক্ষ প্রমাণের চেষ্টা করছেন। তার কমপক্ষে দুইটি লাইসেন্স রয়েছে ১০১ রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকায়। সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকাতেও রয়েছে তার এজেন্সি ও ওয়েলকাম মেডিক্যাল সেন্টার। ১০১ সিন্ডিকেটভুক্ত ফখরুল ইসলামের বেনামী প্রতিষ্ঠান ছিল ত্রিবেনি ইন্টারন্যাশনাল ও সেলিব্রেটি ইন্টারন্যাশনাল। প্রতিষ্ঠান দুটির মালিকানায় অন্য ব্যক্তির নাম থাকলেও যার নেপথ্য মালিক ও অংশীদার ফখরুল ইসলাম। তিনি নিজের লাইসেন্স সরাসরি ব্যবহার না করে অন্যের নামে ব্যবসা করছেন। অন্য যারা ব্যবসা করেন তাদের লাইসেন্স ছিল একটি। আর ফখরুল ব্যবসা করেছেন দুই লাইসেন্সে। তাছাড়া অন্য ব্যবসায়ীরা মূল ১০১ এজেন্সির মধ্যে অথবা সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে ছিলেন। আবার অনেকে ছিলেন শুধু মেডিক্যাল সেন্টার ব্যবসায়। কিন্তু ফখরুলই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সব জায়গায় আছেন এবং দেদারছে ব্যবসা করেছেন।
ফেনী জেলার দাগন ভূঁইয়া উপজেলার বাসিন্দা আলমাস বলেন, ‘আমি দুবাই যাওয়ার জন্য ফকরুলের বারিধারার অফিসে দুই লাখ টাকা জমা দিয়েছি। আমাকে দুই বছরেও ভিসা দেয়নি। অথচ সুদে টাকা নিয়ে তাকে আমি টাকা দিয়েছিলাম।’ একই রকম অভিযোগ করেন মানিকগঞ্জের মোস্তফা, রাজবাড়ির সিরাজসহ অনেকে। এ ছাড়া মেডিকেল চেকআপের নামেও কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন ফকরুল।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বাসিন্দা মিরাজ হোসেন বলেন, মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য রিক্রুটিং এজেন্সি হিউম্যান রিসোর্সে আওতাধীন ওয়েলকাম মেডিক্যাল সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান তিনি। দু-দু’বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে গিয়ে ৩০ হাজার টাকা খরচ করেন মিরাজন। কিন্তু তিনি ভিসা পাননি। তিনি বলেন, ‘এত মেডিক্যাল করে কী লাভ হলো। এই টাকাও তো আর ফেরত পাব না। ওয়েলকামের মালিক ফকরুলের কাছে গেলে তিনি হুমকি দেন।’ এ রকম অসংখ্য শ্রমিক তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান।
গত বছরের ৩১ মে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার পর ফখরুল ইসলাম অপর বিতর্কিত ব্যবসায়ী নূর আলীসহ কয়েকজন মিলে ভিন্ন কৌশলে সিন্ডিকেট করার চেষ্টা করেন। মালয়েশিয়ার ক্ষমতাশীল একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাধর কতিপয় নেতার সঙ্গে তাদের কয়েকজনের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি রামরু নামে একটি বেসরকারি এনজিওর সঙ্গে মিলে দেশের স্বার্থ ও শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন ফকরুল।
ফকরুল বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিভিন্ন স্ববিরোধী বক্তব্য দেন। তার দাবী ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (এফডব্লিউসিএমএস) বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দেশে কার্যকর করতে পারেননি। সংশ্ষ্টিরা বলছেন বিষয়টি মিথ্যাচার। এফডব্লিউসিএমএস মালয়েশিয়ার জনশক্তি আমাদানী বিষয়ক সফটওয়্যার। সকল সোর্স কান্ট্রি থেকে একই নিয়ে তারা শ্রমিক নিয়ে থাকেন। ফখরুলের দাবী এফডব্লিউসিএমএস দুই দেশের সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করেছে। যা নিলর্জ মিথ্যাচার। ফখরুল বলেন, অনেকে ভিসা নিয়ে এসেছেন, আমি নিজেও ভিসা এনেছি। সেটা অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে পাঠাতে হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ থেকে জানা গেছে, জনশক্তি রপ্তানী খাতা নানা অনিয়মরে মাধ্যমে মোহাম্মদ ফখরুল বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। বারিধারা জে ব্লকের ৮ নম্বর সড়কের ১০ নম্বর প্লটে করেছেন ১০ তলা ভবন। এই ভবনে তার হিউম্যান রিসোর্স ও ওয়েলকাম মেডিকেল সেন্টারের কার্যালয়। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় করেছেন বাড়ি। নামে বেনামে রয়েছে একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট। ব্যাংকে রয়েছে বিপুল পরিমান স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি। গ্রামের বাড়ি ফেনী জেলার দাগনভূঁঞার ওমরপুরে বিপুল পরিমান ফসলী জমি ক্রয় করেছেন তিনি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে ফকরুল বলেন, আমি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলি। এজন্য আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আর মেয়াদোত্তীর্ণ সভাপতি সাধারণ সম্পাদকের নেমপ্লেট খুলে নেওয়ার মানে বায়রা অফিসে হামলা ভাংচুর নয়।
প্রধান কার্যালয়ঃ মহা সি.এন.জি ভবন সংলগ্ন (৪র্থ তলা), ঢাকা- ময়মনসিংহ রোড, মাওনা চৌরাস্তা, শ্রীপুর, গাজীপুর।
মোবাইলঃ ০১৫৩১-১৭২৭৫০ , ইমেইলঃ dbhorerpatrika.com
ওয়েবসাইটঃ www.bhorerpatrika.com বিজ্ঞাপনঃ ০১৩০৫-৯৫০৬২৫ ইমেইলঃ info@bhorerpatrika.com