
সিরাজুল ইসলাম : বিকেলের শেষ আলোয় খুলনার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীর চরে পা রাখতেই কাদায় দেবে যায় পা। নদীর লোনাপানিতে কোমরসমান ডুবে জাল টানছেন পুষ্প রানী সানা (৪৫)। পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর অসুস্থ স্বামী বিন্দু সানা। জালে ধরা ক্ষুদ্র চিংড়ির রেণু পোনা গুনছেন দুজন।
‘আজ কপাল ভালো। তিন ঘণ্টায় ১১৯টা পোনা পাইছি,’ বললেন পুষ্প রানী।
এই ১১৯টি পোনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাঁদের এক দিনের খাবারের নিশ্চয়তা।
পুষ্প রানীর মতো হাজারো নারী-পুরুষ প্রতিদিন সুন্দরবনসংলগ্ন নদীগুলোতে নেমে চিংড়ির রেণু পোনা আহরণ করেন। আইনত নিষিদ্ধ হলেও জীবিকার তাগিদে এ কাজ থেকে সরে আসতে পারছেন না তাঁরা। স্থানীয় পরিবেশবাদী ও মৎস্য সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, সাতক্ষীরা ও খুলনার উপকূলজুড়ে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রেণু পোনা আহরণ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত।
শ্যামনগরের গাবুরা, মুন্সীগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী, কৈখালী, পদ্মপুকুর থেকে শুরু করে কয়রার বানিয়াখালী, নয়ানী, কাশীরহাটখোলা ও মদিনাবাদ—সবখানেই একই দৃশ্য। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নারী-পুরুষ নদীতে জাল টানছেন।
গাবুরার হামিদ গাজী বলেন, ‘আইন করে বন্ধ করলেও পেট তো বন্ধ হয় না। এলাকায় কোনো কাজ নাই। পোনা ধরেই সংসার চালাই।’
ডুমুরিয়া গ্রামের মমতাজ বেগম বলেন, ‘ছোটবেলা থেইকা পোনা ধরি। দিনে ৩০০-৫০০ টাকা আয় হয়। ফড়িয়ারা নদীর পাড় থেইকাই কিনে নেয়।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, এক হাজার রেণু পোনা বিক্রি করে গড়ে এক হাজার টাকার মতো পাওয়া যায়। তবে প্রতিদিন সেই পরিমাণ পোনা মেলে না। কখনো ২০০, কখনো ৩০০ টাকার আয়েই দিন পার করতে হয়।
২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলা বদলে দিয়েছে উপকূলের মানুষের জীবন।
পুষ্প রানী বলেন, ‘আইলায় ঘরবাড়ি সব ভাসাই নিল। এখন বেড়িবাঁধের ধারে ঝুপড়িতে থাকি। জমিজমা নাই। ছেলে-মেয়েরা আলাদা সংসার করে। নিজেদেরই চলে না, আমাদের দেখবে কেমনে?’
পাথরখালী গ্রামের বেড়িবাঁধের পাশে ছোট্ট ঘরেই কাটছে তাঁদের জীবন। জোয়ারের সময় ঘরের ভেতর পর্যন্ত পানি উঠে আসে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন উপকূলের নারীরা।
পুরুষেরা কাজের খোঁজে শহরে চলে গেলে পরিবার চালানোর দায়িত্ব এসে পড়ে নারীদের ওপর। বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে তাঁরা নদীতে নেমে রেণু পোনা ধরতে বাধ্য হচ্ছেন।
শ্যামনগরের ঝাঁপা গ্রামের একাদশী মণ্ডল বলেন, ‘ভোর রাতে নদীতে নামতে ভয় লাগে। সাপ, কুমির, কামট আছে। ঝড় উঠলে বাঁচার উপায় নাই। তবু পেটের দায়ে নামতে হয়।’
ঘণ্টার পর ঘণ্টা লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে নারীরা নানা ধরনের শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
কামালকাটি গ্রামের সীতা রানী মণ্ডল বলেন, ‘গায়ে ঘা হয়, চুলকায়, পায়ে কুনি বসে, হাঁটতে কষ্ট হয়। চিকিৎসার পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়।’
কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. সুজিত কুমার বৈদ্য বলেন, উপকূলীয় নারীদের মধ্যে প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ, চর্মরোগ ও পুষ্টিহীনতার সমস্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। লবণাক্ত পানির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এর অন্যতম কারণ।
গাবুরা ইউনিয়নে তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই।
জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের নৌকায় নদী পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে যেতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রোগীর মৃত্যু ঘটে।
ডুমুরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিএইচসিপি হেলেনা বিলকিস বলেন, ‘প্রতিদিন আসা রোগীদের বড় অংশই নারী। জরায়ু সংক্রমণ, চর্মরোগ ও অপুষ্টির সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।’
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বিচারে রেণু পোনা আহরণের কারণে নদীর জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শ্যামনগর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এভাবে অপরিকল্পিতভাবে পোনা আহরণ চলতে থাকলে ভবিষ্যতে মৎস্যসম্পদ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।’
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া কীভাবে বন্ধ হবে এই পেশা?
পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিসের সাতক্ষীরা ইউনিটের সমন্বয়ক এস এম শাহিন আলম বলেন, ‘উপকূলের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রেণু পোনার ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে এই কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব নয়।’
উপকূলের নদীগুলো প্রতিদিন হাজারো মানুষের হাতে তুলে দেয় একমুঠো রেণু পোনা। সেই পোনাই হয়ে ওঠে একমুঠো ভাতের নিশ্চয়তা। আর সেই ভাতের আশাতেই প্রতিদিন ভোরে লোনাপানিতে নেমে পড়েন পুষ্প রানীর মতো হাজারো নারী-পুরুষ।
আইন, পরিবেশ ও জীবিকার টানাপোড়েনের মধ্যেই উপকূলের মানুষের জীবন ভেসে চলেছে নোনাজলের স্রোতে।
প্রধান কার্যালয়ঃ মহা সি.এন.জি ভবন সংলগ্ন (৪র্থ তলা), ঢাকা- ময়মনসিংহ রোড, মাওনা চৌরাস্তা, শ্রীপুর, গাজীপুর।
মোবাইলঃ ০১৫৩১-১৭২৭৫০ , ইমেইলঃ dbhorerpatrika.com
ওয়েবসাইটঃ www.bhorerpatrika.com বিজ্ঞাপনঃ ০১৩০৫-৯৫০৬২৫ ইমেইলঃ info@bhorerpatrika.com