

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয় এখন রাস্তা। সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার উপকূলীয় জনপদে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা। নদীর পাড় ভাঙছে, ঢুকছে লবণপানি—আর ভিটেমাটি হারিয়ে মানুষ ঠাঁই নিচ্ছে বাঁধ, সড়ক কিংবা অস্থায়ী বসতিতে।
উপকূলের মানুষের কাছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর নদীভাঙনে বিপর্যস্ত হচ্ছে জীবন-জীবিকা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বেড়েছে লবণাক্ততা, নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি, সংকট দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির। টিকে থাকার লড়াইয়ে পেশা বদলাচ্ছেন মানুষ, কেউ কেউ পাড়ি জমাচ্ছেন শহরে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় ১৯টি জেলায় বসবাস করে চার কোটির বেশি মানুষ। দেশের আয়তনের প্রায় ৩২ শতাংশ জুড়ে থাকা এই অঞ্চলের একটি প্রাচীন জনগোষ্ঠী হলো মুন্ডারা। খুলনার কয়রা ও ডুমুরিয়া এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর, দেবহাটা ও তালা উপজেলায় তাদের বসবাস। সুন্দরবননির্ভর এই জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি শিকার।
শ্যামনগরের কালিঞ্চি, ভেটখালী, কাশিপুর কিংবা কয়রার টোপখালীর মুন্ডা পরিবারগুলোর প্রায় ৯৫ শতাংশই ভূমিহীন। দিনমজুরি, মাছ ধরা, কাঠের কাজ কিংবা সুন্দরবনের ওপর নির্ভর করেই চলে জীবন। তবে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও লবণপানির প্রবেশে কৃষি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অনেকেই ইটভাটা কিংবা শহরমুখী শ্রমে ঝুঁকছেন।
কয়রার টোপখালীর বাসিন্দা শরৎ মুন্ডা বলেন, ‘আইলার পর থেকে আমাদের জীবনটাই বদলে গেছে। লবণপানির কারণে ফসল হয় না, নানা রোগে ভুগছি। মেয়েদের সমস্যা আরও বেশি। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাও ঠিকমতো করাতে পারছি না।’
লবণাক্ত পানির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নারীদের ওপর। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিবেশবিদদের মতে, উপকূলীয় এলাকায় জরায়ুজনিত রোগ, চর্মরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও গর্ভকালীন জটিলতা বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। অনেক নারীকে অল্প বয়সেই জরায়ু অপসারণ করতে হচ্ছে।
পোড়াকাটলা এলাকার মিতা রানী বলেন, ‘তলপেটে সব সময় ব্যথা। ডাক্তার অপারেশন করতে বলেছে, কিন্তু সাহস পাচ্ছি না।’
দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা ও পুরুষদের কাজের খোঁজে শহরমুখী হওয়ার ফলে বেড়েছে বাল্যবিবাহ। সাতক্ষীরার অনেক গ্রামে কিশোরী বয়সী অবিবাহিত মেয়েই খুঁজে পাওয়া যায় না।
এদিকে সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদী থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের ফলে বেড়েছে নদীভাঙন। স্থানীয়দের অভিযোগ, শক্তিশালী একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বালি উত্তোলন করছে। এতে ঝুঁকিতে পড়ছে বেড়িবাঁধ ও লোকালয়।
পরিবেশবিদ অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, ‘সুন্দরবন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে। কিন্তু অপরিকল্পিত বালি উত্তোলন ও মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড এই বনকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা এবং বিকল্প জীবিকায় প্রশিক্ষণ ছাড়া উপকূলীয় সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। ত্রাণনির্ভরতা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
প্রতি বর্ষা মৌসুম এলেই উৎকণ্ঠা নিয়ে দিন কাটে উপকূলবাসীর। ঘূর্ণিঝড় এলেই ঘর ছাড়তে হয়, আশ্রয়কেন্দ্রেও নেই পর্যাপ্ত খাবার ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ। বারবার প্রকল্প নেওয়া হলেও টেকসই সমাধান মিলছে না।
নদীভাঙন, লবণাক্ততা আর অব্যবস্থাপনার চাপে উপকূলের মানুষ আজ অস্তিত্বের সংকটে। সরকারের কার্যকর উদ্যোগ ও জলবায়ু সুবিচার ছাড়া এই জনপদ বাঁচানো কঠিন—এমনটাই বলছেন উপকূলের মানুষ।
প্রধান কার্যালয়ঃ মহা সি.এন.জি ভবন সংলগ্ন (৪র্থ তলা), ঢাকা- ময়মনসিংহ রোড, মাওনা চৌরাস্তা, শ্রীপুর, গাজীপুর।
মোবাইলঃ ০১৫৩১-১৭২৭৫০ , ইমেইলঃ dbhorerpatrika.com
ওয়েবসাইটঃ www.bhorerpatrika.com বিজ্ঞাপনঃ ০১৩০৫-৯৫০৬২৫ ইমেইলঃ info@bhorerpatrika.com