

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের মানচিত্রে দক্ষিণের আঁকাবাঁকা তটরেখা শুধু ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য নয়, এটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার আধার। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে এই উপকূলীয় জনপদ আজ অস্তিত্ব সংকটে। নদীভাঙন, লবণাক্ততার আগ্রাসন আর ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কায় প্রতিদিনই বড় হচ্ছে জলবায়ু শরণার্থীর মিছিল।
সাতক্ষীরা বা খুলনার উপকূলের গ্রামগুলোতে গেলে বাতাসের সঙ্গে মিশে থাকা নোনাধরা স্বাদ টের পাওয়া যায়। যেখানে একসময় ধানের শীষ দোল খেত, সেখানে এখন বিস্তীর্ণ নোনা পানির চিংড়ি ঘের। বাহ্যিকভাবে এটিকে উন্নয়ন মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে মানুষের দীর্ঘশ্বাস। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে জোয়ারের পানি আগের চেয়ে অনেক গভীরে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। বাঁধ ভেঙে নোনা পানি ঢুকলে তা সহজে নামে না। ফলে পুকুর, কৃষিজমি ও বসতভিটা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একজন কৃষক যখন দেখেন তাঁর জমিতে আর ধান ফলছে না, তখন সামনে দুটি পথ খোলা থাকে—অনাহার অথবা স্থানান্তর। অধিকাংশই বেছে নেন দ্বিতীয় পথটি। জীবিকার সন্ধানে তারা পাড়ি জমান শহরের দিকে। এভাবেই জন্ম নিচ্ছে জলবায়ু শরণার্থী।
সিডর, আইলা কিংবা আম্পানের মতো ঘূর্ণিঝড়গুলো উপকূলের মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। দুর্যোগের পর ত্রাণ এলেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার সুযোগ খুব কম। ভেঙে যাওয়া বাঁধ বছরের পর বছর মেরামত হয় না। একবার লবণাক্ত হলে জমি ফসলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এই ক্ষতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা নেই একজন সাধারণ জেলে বা কৃষকের। ফলে শহরমুখী হওয়াই হয়ে ওঠে শেষ ভরসা।
কিন্তু শহরের জীবন তাদের জন্য স্বস্তির নয়। খুলনার দাকোপ বা সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে আসা মানুষ ঢাকার বস্তিতে ঠাঁই নেন। গ্রামে যেখানে তাঁদের নিজস্ব জমি ও সামাজিক পরিচয় ছিল, শহরে তারা হয়ে যান অদৃশ্য শ্রমিক। স্ত্রীদের অন্যের বাড়িতে কাজ নিতে হয়, শিশুরা বেড়ে ওঠে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। এই স্থানান্তর শুধু অর্থনৈতিক নয়, গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকটও তৈরি করছে।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো শহরগুলো ইতিমধ্যে জনসংখ্যার ভারে নুয়ে পড়েছে। এই অতিরিক্ত চাপ সামলানোর সক্ষমতা তাদের নেই।
আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ভুক্তভোগী। কার্বন নিঃসরণে ভূমিকা সামান্য হলেও এর মূল্য দিতে হচ্ছে চড়া দামে। উন্নত দেশগুলোর শিল্পায়নের খেসারত দিচ্ছে আমাদের উপকূলের মানুষ। জলবায়ু তহবিল থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং এর ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল বাঁধ নির্মাণ এই সমস্যার সমাধান নয়। উপকূলীয় বনায়ন, বিশেষ করে সুন্দরবন রক্ষা করা জরুরি। পাশাপাশি লবণসহিষ্ণু ফসলের বিস্তার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় কুটির শিল্প, হাঁস-মুরগি পালন ও স্থানীয় উদ্যোগে সহায়তা দেওয়া গেলে মানুষ নিজের ভিটে আঁকড়ে থাকার সুযোগ পাবে।
জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমান বাস্তবতা। বরগুনা বা পটুয়াখালীর কোনো এক বৃদ্ধ যখন ভেঙে যাওয়া ভিটার দিকে তাকিয়ে থাকেন, তখন বোঝা যায় এই সংকট কতটা গভীর। তিনি জানেন, তাঁর শেকড় এখানে। কিন্তু জানেন না সন্তানের ভবিষ্যৎ কোথায়।
জলবায়ু শরণার্থীরা কোনো পরিসংখ্যান নয়, তারা রক্তমাংসের মানুষ। তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচার পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তবে বৈশ্বিক উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং অভিযোজন প্রক্রিয়ায় জোর দিতে হবে।
উপকূল রক্ষা মানে বাংলাদেশ রক্ষা। এই সত্য যত দেরিতে উপলব্ধি হবে, ক্ষতির পরিমাণ তত বাড়বে। নোনা পানিতে আর কোনো কৃষকের চোখের পানি মিশতে দেওয়া যায় না। সময় থাকতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।
প্রধান কার্যালয়ঃ মহা সি.এন.জি ভবন সংলগ্ন (৪র্থ তলা), ঢাকা- ময়মনসিংহ রোড, মাওনা চৌরাস্তা, শ্রীপুর, গাজীপুর।
মোবাইলঃ ০১৫৩১-১৭২৭৫০ , ইমেইলঃ dbhorerpatrika.com
ওয়েবসাইটঃ www.bhorerpatrika.com বিজ্ঞাপনঃ ০১৩০৫-৯৫০৬২৫ ইমেইলঃ info@bhorerpatrika.com