দখল ও দূষণে অস্তিত্ব সংকটে ডাকাতিয়া নদী, হারিয়ে যাচ্ছে নৌপথের ঐতিহ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

নিজস্ব প্রতিবেদক, লক্ষ্মীপুর : লক্ষ্মীপুরের রায়পুর ও সদর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একসময়কার খরস্রোতা ডাকাতিয়া নদী এখন পানিশূন্য ও নাব্যতা হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত ভরাটের কারণে নদীটি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

একসময় এই নদীতে পালতোলা নৌকা, বড় লঞ্চ ও মালবাহী ট্রলারের নিয়মিত চলাচল ছিল। শুষ্ক মৌসুমেও কৃষকরা সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি পেতেন এবং দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ছিল। স্থানীয়দের জীবিকার প্রধান উৎস ছিল এই নদী। তবে বর্তমানে নদীটি প্রায় স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে।

চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরের ছয়টি উপজেলা জুড়ে প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ডাকাতিয়া নদী ও এর শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত। তবে নাব্যতা সংকট ও নিয়মিত খননের অভাবে বছরের অধিকাংশ সময় এটি বালুচরে পরিণত হয়।

সরেজমিনে রায়পুর এলাকায় দেখা যায়, নদীর কোথাও ফসলি জমি, কোথাও ফেটে যাওয়া শুকনো তলদেশ, আবার কোথাও মাটি কেটে নেওয়ার চিহ্ন। দুই পাড়জুড়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি। হোটেল ও কারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে নিয়মিতভাবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দখল ও দূষণের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হয়ে গেছে। কচুরিপানার বিস্তারে অনেক অংশ ঢেকে গেছে। পানি দূষণের কারণে মাছ মারা যাচ্ছে এবং এলাকায় মশার উপদ্রবও বেড়েছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে রায়পুর পৌর এলাকার কিছু অংশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হলেও পরে আর নিয়মিত কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায়।

ডাকাতিয়া নদী ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপন্ন হয়ে কুমিল্লা, ফেনী, চাঁদপুর হয়ে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর দিয়ে মেঘনায় মিলিত হয়েছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২০৭ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ প্রায় ৬৭ মিটার হলেও বর্তমানে অনেক স্থানে এটি ৩০ থেকে ৪০ ফুটের সরু খালে পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বাসাবাড়ি, হোটেল ও শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি প্রভাবশালীদের দখলের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

রায়পুর পৌরসভার বাসিন্দা ও নদী বাঁচাও আন্দোলনের সংগঠক জিল্লুর রহমান বলেন, “একসময় এই নদী ছিল এলাকার প্রাণ। এখন দখল আর দূষণে এটি প্রায় মৃত। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ডাকাতিয়া নদীর অস্তিত্বই হারিয়ে যাবে।”

পানি উন্নয়ন বোর্ডের লক্ষ্মীপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ উজ্জামান খান বলেন, “ডাকাতিয়া নদী ও সংশ্লিষ্ট খাল খননের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে খনন কাজ শুরু হবে। পাশাপাশি দখলদারদের উচ্ছেদেও উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, “সরকারের খাল খনন ও পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় নদী ও খাল পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কিছু খালের খনন কাজ শুরু হয়েছে, আরও প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

এদিকে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছেন, দেশের নদী ও খাল পুনরুদ্ধারে সরকারের ২০ হাজার কিলোমিটার খনন পরিকল্পনা চলমান রয়েছে।

তবে স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পনার পাশাপাশি দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ডাকাতিয়া নদী পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।