
নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন জেলায়—সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটে—লোনা পানিভিত্তিক চিংড়ি চাষে নেমে এসেছে স্থবিরতা। উৎপাদন খরচ বেড়ে দ্বিগুণ হলেও বাজারদর অর্ধেকে নেমে আসায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক চাষিরা। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিদেশে চাহিদা কমে যাওয়ায় রপ্তানি আয়ও বড় পতনের মুখে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো–ইপিবির তথ্য বলছে, ২০২১–২২ অর্থবছরে চিংড়ি রপ্তানি ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও চলতি ২০২২–২৩ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এ খাতের আয় কমেছে ৩১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ৪০ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। এবার লক্ষ্য ধরা হলেও তা পূরণ হওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাজারে দাম কম, খাদ্যে সিন্ডিকেটে চাষিরা বিপাকে
চাষিদের অভিযোগ, উৎপাদন ব্যয় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। গমের ভুসি, পালিশ কুঁড়া, ফিশ ফিড, সয়াবিন খইল—সব কিছুর দাম লাফিয়ে বেড়েছে। এক বছরে—
গমের ভুসি: ৮০০ → ১,৯০০ টাকা
পালিশ কুঁড়া: ১,১০০ → ১,৭০০ টাকা
ফিশ ফিড (২৫ কেজি): ৮০০ → ১,৬০০ টাকা
সয়াবিন খইল (৫০ কেজি): ১,৮০০ → ৩,৭১০ টাকা
চাষিদের দাবি, খাদ্য বিক্রেতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেটেই দাম বাড়ছে। অন্যদিকে বাজারে চিংড়ির দর কমেছে কেজিতে ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা।
‘পুশকরা’ চিংড়িতে রপ্তানিতে ধস
চিংড়িতে ভেজাল দ্রব্য পুশ করার পুরোনো প্রবণতা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ডাক্তারি সিরিঞ্জ দিয়ে দূষিত পানি, জেলি, মাড়, ফিটকিরি ইত্যাদি ঢুকিয়ে ওজন বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। এতে দেশে–বিদেশে চিংড়ির মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রপ্তানিকারকদের মতে, বিদেশে একবার অপদ্রব্য ধরা পড়লে পুরো চালানই বাতিল হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালত ও জরিমানার পরও এ অনিয়ম পুরোপুরি রোধ করা যাচ্ছে না বলে স্থানীয় ব্যবসায়ী–চাষিরা জানাচ্ছেন।
জল সংকট ও রোগব্যাধিতে উৎপাদন কম
চাষিরা আরও বলছেন, বর্ষায় পানি লবণাক্ততা কমে যায়, আর শুষ্ক মৌসুমে নদনদীতে পানি থাকে না। অধিকাংশ নদ-নদী পলিতে ভরাট হয়ে যাওয়ায় ঘেরে সময়মতো লোনা পানি তোলা যায় না। ফলে জানুয়ারি–এপ্রিল অনেক ঘেরই পানিশূন্য থাকে। জোয়ার–ভাটার স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ায় চিংড়ির পোনা ছাড়তে দেরি হয়।
এ ছাড়া ভাইরাস ও রোগবালাইয়ে হরিনা ও বাগদা চিংড়ি মারা যাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে।
চাষিরা কী চান
চিংড়ি চাষিরা ও সংশ্লিষ্টরা কয়েকটি দাবি তুলেছেন—
অপদ্রব্য পুশ বন্ধে কঠোর আইন ও জেলজরিমানার ব্যবস্থা খাদ্য। সিন্ডিকেট রোধে নজরদারি
রোগমুক্ত পোনার পরীক্ষাগার বাড়ানো
নদ-নদী খনন করে ঘেরে লোনা পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। ঘের সংস্কারের জন্য স্বল্পসুদে সরকারি ঋণ
উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ
উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর চাষ ব্যবস্থাপনার প্রসার
চাষিদের ভাষায়, “এভাবে চলতে থাকলে হোয়াইট গোল্ড হিসেবে পরিচিত চিংড়ি আর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য হিসেবে টিকে থাকবেনা।”
