
আলামীন, রংপুর : জেল-জুলুম, নির্যাতন, গুম-হত্যা এবং রক্তাক্ত আন্দোলনের দীর্ঘ সংগ্রামের স্মৃতি বুকে ধারণ করে দেশব্যাপী পালিত হয়েছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের স্মরণে ৫ আগস্ট দিনটি জাতীয়ভাবে পালন করা হয়। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এটি ‘ক’ শ্রেণির জাতীয় দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল— “জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ”।
দিবসটি উপলক্ষে রংপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সকাল ১০টায় রংপুর টাউন হলের বিপরীতে অবস্থিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। পরে সকাল সাড়ে ১০টায় রংপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে ‘জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভা’ অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান সামু, রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন এবং রংপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মো. শহিদুল ইসলাম, এনডিসি, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর রংপুর রেঞ্জের উপমহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল, রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ, রংপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের সদস্য এবং জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। বক্তারা শহীদদের আত্মত্যাগ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, আহত, নির্যাতিত ও সংগ্রামী মানুষের অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে। তারা জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান সামু বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই চেতনাকে ধারণ করে আমাদের উন্নয়নের প্রতিটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। রংপুরকে একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে আরডিএ নিরলসভাবে কাজ করবে। উন্নয়নের প্রতিটি উদ্যোগে জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের যেকোনো যৌক্তিক প্রয়োজনে আমরা পাশে থাকব।”
তিনি আরও বলেন, “জুলাইয়ের চেতনা শুধু একটি দিনের স্মরণ নয়, এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণের অঙ্গীকার। দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন ও উন্নত রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।”
বক্তারা আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, দল বা সংগঠনের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল ছাত্র-জনতা, শ্রমজীবী মানুষ, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-জুলুম, নির্যাতন, গুম-হত্যা ও আত্মত্যাগের সম্মিলিত ফসল। তাই এই আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়নের দাবি জানান বক্তারা।
আলোচনা সভায় বক্তারা আরও বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব জনগণের কল্যাণে কাজ করবে। রংপুর সিটি করপোরেশন, রংপুর জেলা পরিষদ এবং রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জনগণের সহযোগিতা কামনা করা হয়। একই সঙ্গে জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের যেকোনো সমস্যা সমাধানে পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
এদিকে দিবসটি উপলক্ষে বুধবার সকাল ৯টায় জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে রংপুর জেলা বিএনপি। এ সময় জেলা, উপজেলা, পৌর বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।এব সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
রংপুর ছিল ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। সংঘর্ষ, হতাহত ও আহত হওয়ার একাধিক ঘটনা রংপুরবাসীর স্মৃতিতে আজও অম্লান হয়ে রয়েছে।
আন্দোলনের একজন প্রত্যক্ষদর্শী নয়ন সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, রংপুর হাইস্কুলের সামনে চারদিকে পুলিশের ব্যারিকেড ছিল। আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড সরিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে রাবার বুলেটের পরিবর্তে গুলির শব্দ শোনা যায়। তিনি দাবি করেন, সামনে থাকা এক সহকর্মী তাকে সরিয়ে না দিলে তিনিও প্রাণ হারাতে পারতেন। আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাস্তাজুড়ে রক্তাক্ত মানুষের দৃশ্য আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তাঁর ভাষায়, “চারদিকে শুধু রক্ত আর রক্ত ছিল। তাই সেই আন্দোলনকে আমি রক্তাক্ত জুলাই বলি।”
স্থানীয়দের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের প্রতীক। তাই শহীদদের আত্মত্যাগ, আহতদের ত্যাগ এবং নির্যাতিত মানুষের অবদান ইতিহাসে যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ করা জাতির দায়িত্ব।
সরকারি কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নানা কর্মসূচি পালন করে। শ্রদ্ধা, স্মরণ ও সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে রংপুরবাসী জুলাইয়ের শহীদ ও যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে এবং উন্নত, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানায়।
প্রধান কার্যালয়ঃ মহা সি.এন.জি ভবন সংলগ্ন (৪র্থ তলা), ঢাকা- ময়মনসিংহ রোড, মাওনা চৌরাস্তা, শ্রীপুর, গাজীপুর।
মোবাইলঃ ০১৫৩১-১৭২৭৫০ , ইমেইলঃ dbhorerpatrika.com
ওয়েবসাইটঃ www.bhorerpatrika.com বিজ্ঞাপনঃ ০১৩০৫-৯৫০৬২৫ ইমেইলঃ info@bhorerpatrika.com