
সিরাজুল ইসলাম সাতক্ষীরা প্রতিনিধি।জলবায়ু পরিবর্তন ও তার কুফল নিয়ে বিশ্বের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কমতি নেই। সময়ের বিবর্তনে পরিবর্তনশীল জলবায়ুর এই চক্র বিশ্বের বসবাসরত সকল প্রাণীকুলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান এবং ব-দ্বীপপ্রধান দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশ একটি দুর্যোগ প্রবণ দেশ। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন-ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, খরা, বন্যা, নদী ভাঙন বাংলাদেশের নিত্যসঙ্গী। এর মধ্যে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের দুর্যোগ। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব এ দেশে প্রতিনিয়তই দৃশ্যমান। জলবায়ু পরিবর্তন স্পষ্টতই মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলছে। উপকূলের মানুষ প্রতিনিয়ত জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশের এই বিপর্যয়কে বাংলাদেশ বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান-এ দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সত্যিই পড়ছে কিনা, তা বিভিন্ন মানদন্ডে বিবেচনা করা হয়। যেমন- জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কোথায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি হচ্ছে, সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা কোথায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশটি ক্ষতি মোকাবিলায় বা অভিযোজনের জন্য এরই মধ্যে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ একাধারে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার এবং হিমালয়ের বরফ গলার কারণে নদীর দিক পরিবর্তন, বন্যা ইত্যাদি সবগুলো দিক দিয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও অনেক বেশি। তাই এসব মানদন্ডেই বাংলাদেশ রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় শীর্ষে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ-এর দুই হাজার দশ
-এ প্রকাশিত গ্লােবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ দশটি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে প্রথমেই অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এই সমীক্ষা চালানো হয় উনিশ শো নব্বই থেকে দুই হাজার নয় পর্যন্ত একশ তিরানব্বই টি দেশের উপর। পরবর্তীতেও অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।
আবহমান কাল থেকে এদেশে ঋতুবৈচিত্র্য বর্তমান। ছয় ঋতুর কারণে দেশটিকে ষড়ঋতুর দেশও বলা হয়ে থাকে। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে বর্ষা মৌসুম। এসময় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, যা অনেক সময়ই বন্যায় ভাসিয়ে দেয়। এছাড়াও মৌসুমী বায়ুপ্রবাহের আগমুহূর্তে কিংবা বিদায়ের পরপরই স্থলভাগে ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, কিংবা সাগরে নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হয়, যার আঘাতে বাংলাদেশ প্রায় নিয়মিতই আক্রান্ত হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশের এই স্বাভাবিক চিত্রটি এখন অনেকখানি বদলে গেছে। তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্তর সর্বদিক দিয়ে সংঘটিত এসকল পরিবর্তন বাংলাদেশে জলবায়ুগত স্থূল পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানিপ্রবাহ শুকনো মৌসুমে স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে না। ফলে নদীর পানির বিপুল চাপের কারণে সমুদ্রের লোনাপানি যতটুকু এলাকাজুড়ে আটকে থাকার কথা ততটুকু থাকে না। পানির প্রবাহ কম থাকার কারণে সমুদ্রের লোনাপানি স্থলভাগের কাছাকাছি চলে আসে। ফলে লবণাক্ততা বেড়ে যায় দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল এলাকায়। কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা দিনে দিনে আরো প্রকট হয়ে উঠবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যেই সুন্দরবনের সুন্দরী গাছে ব্যাপক মাত্রায় আগামরা রোগ দেখা দিয়েছে। অনেকে একে মানবসৃষ্ট কারণ উল্লেখ করতে চাইলেও গবেষকরা একে প্রাকৃতিক কারণ হিসেবেই শনাক্ত করেছেন। সুন্দরবনের অন্যান্য গাছও আগামরা ও পাতা কঙ্কালকরণ পোকার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এ দেশ নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রার দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও বিগত কয়েক বছরে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক আচরণে সেই পরিচিতি ম্লান হয়ে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে দেয়া এক ভাষণে মহাসচিব গুতেরেস বলেন, বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকিতে রয়েছে। ক্রমবর্ধমান সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকলে নিচু অঞ্চল এমনকি পুরো দেশ অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে গুতেরেসের সোচ্চারতা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের যেসব দেশ সবচেয়ে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে প্রকৃতিতে যে ঋতুবৈচিত্র্য, তা লোপ পাচ্ছে। এক ঋতুর সঙ্গে আরেক ঋতুর যে পার্থক্য, তা মুছে যাচ্ছে। আর্দ্রতা কমে আসার পাশাপাশি তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের মাত্রা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের দেশে অসময়ে বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়সহ অতি গরম আবহাওয়া তৈরি হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের অনেক এলাকা প্লাবিত হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে আমাদের উপকূলীয় এলাকা এবং সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারসহ অন্যান্য এলাকা। হিমালয়ে বরফ গলে যাওয়ায় এরই মধ্যে পাকিস্তানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি দেখা গেছে।এ অবস্থায় আগামী কয়েক দশকে হিমালয়ের হিমবাহ হ্রাস পাবে, যার ফলে সিন্ধু, গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র নদীগুলো সংকুচিত হবে। গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষের পরিবেশবিরোধী নানারকম ক্রিয়াকলাপের ব্যাপক বৃদ্ধি এবং কয়লা, পেট্রোলিয়াম ইত্যাদি জীবাশ্ম জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড, ক্লোরোফ্লুরো কার্বন, মিথেন, ওজোন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি গ্রিনহাউস গ্যাসের উপস্থিতি বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তরে উষ্ণতা বেড়ে গিয়ে তা প্রভাবিত করছে পৃথিবীর জলবায়ুকে।
বিশেষ করে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের এই পরিবর্তনগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নানারকমের স্বাস্থ্য সমস্যা ডেকে আনছে। সংকট সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত কৌশল প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশের কী করা উচিত, বিশ্বের কী করা উচিত। এ বাস্তবতায় জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে সহায়তার জন্য প্রণীত হয়েছে বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০। এটি অত্যন্ত তথ্যবহুল ও বিজ্ঞানভিত্তিক একটি পরিকল্পনা, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক উৎপাদনের জন্য যেখানে ছিলো যথাযোগ্য তাপমাত্রা, ছিলো ছয়টি আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ঋতু, সেখানে দিনে দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতু হারিয়ে যেতে বসেছে এবং তার সাথে সাথে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা সবকিছুতে আমূল পরিবর্তন আসছে। ফলে অনিয়মিত, অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, সেচের পানির অপর্যাপ্ততা, উপকূলীয় অঞ্চলে বর্ষা মৌসুম ছাড়াও বিভিন্ন সময় উপকূলীয় বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধিতে লবণাক্ত পানিতে জমি ডুবে যাওয়া, এবং শুষ্ক মৌসুমে মাটির নিচের লবণাক্ত পানি উপরের দিকে বা পাশের দিকে প্রবাহিত হওয়ার মতো নানাবিধ সমস্যায় বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ চরম হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশনির্ভর উপজীবীরা তাদের জীবীকা হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়বে। এতে দেশে বেকার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করবে। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে নানারকম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। শ্বাসকষ্ট, হিটস্ট্রোক বা গরমজনিত মৃত্যু কিংবা তীব্র ঠান্ডাজনিত মৃত্যু ইত্যাদি এখন খুব সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভূমন্ডলীয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রভাবিত হবে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা। উপকূলীয় এলাকায় বর্ধিত হারে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষ।
এসকল আশ্রয়হীন উদ্বাস্তুরা আশ্রয় নিচ্ছে নিকটবর্তী বড় শহরগুলোতে কিংবা রাজধানী শহরে। ফলে বাড়ছে সেসব শহরের জনসংখ্যা। বাড়তি জনসংখ্যার চাপ সামলাতে সেসব শহরগুলো হিমশিম খাচ্ছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার জন্য আয়ের অতিরিক্ত উৎস তৈরি না হওয়াতে উদ্বাস্তু মানুষেরা বেছে নেয় নানা অপকর্মের পথ। সমাজে দেখা দিতে শুরু করেে বিশৃঙ্খলা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে থাকে দিনের পর দিন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণকে ধরা হয়; যার কারণে কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক উষ্ণতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের গুটিকয়েক দেশ তথা শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো অধিক হারে কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী, কিন্তু এর প্রভাব পড়ছে বিশ্বের প্রতিটি দেশে। ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে কার্বন নিঃসরণের হার কমানো ও জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ হ্রাস করার কথা থাকলেও কোনো দেশই এখন পর্যন্ত এই বিষয়গুলো তেমন গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেয়নি। এতে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো মারাত্মকভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের উচ্চ ঝুঁঁকিতে রয়েছে। ছোট আয়তন, বিপুল জনসংখ্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কম উচ্চতায় হওয়ায় এ দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁঁকি অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেকাংশে বেশি। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান প্রভাব হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় লবণাক্ততা বৃদ্ধি। এমনিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে লোনা পানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে ফলে সেই স্থানে কমে যাচ্ছে চাষাবাদ ও বসবাস। বাংলাদেশ আয়তনে ছোট পক্ষান্তরে জনসংখ্যায় বহুল তাই দূষণ এই দেশটির মিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিক জনসংখ্যার চাপে বাংলাদেশ বর্তমানে দূষিত একটি ভূ-খণ্ডে পরিণত হয়েছে। বেশ কিছুদিন আগে এক জরিপে বলা হয়েছে রাজধানী ঢাকা দূষিত এবং বসবাসের অযোগ্য। সুতরাং পরিবেশ দূষণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
সুস্থ থাকতে ও বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করতে হলে বায়ুদূষণ কমানোর বিকল্প নেই। আর এজন্য প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ খুবই জরুরি। অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ এবং বিষাক্ত বিভিন্ন পদার্থ বাতাসে মিশে দেশের সামগ্রিক আবহাওয়ায় পরিবর্তন আনছে। তার উপর বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশকে ক্রমেই বসবাসের অযোগ্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অনেক অঞ্চল ইতোমধ্যে লবণাক্ততার কারণে বসবাস ও চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। যা হয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণে। বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি করেছেন এভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি বাড়তে থাকলে বাংলাদেশের অনেক অঞ্চল পানির নিচে চলে যাবে। সৃষ্টি হতে পারে স্থায়ী জলাবদ্ধতা। তাছাড়া এই বিশ্বের উষ্ণতা যতই বাড়ছে হিমালয় ততই গলছে। অতিরিক্ত উষ্ণতার কারণে ঋতুতেও হেরফের দেখা দিচ্ছে। অসময়ে বৃষ্টি, বন্যা হানা দিচ্ছে। সাগরে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন ঘূর্ণিঝড়। যা বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে সক্ষম। আদিকাল থেকে বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড়ের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লালিত-পালিত হয়েছে ফলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সাফল্য লাভ করেছে। লক্ষ্য করলেই দেখা যায় অতীতের তুলনায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমে এসেছে। কিন্তু সমুদ্রের লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বিরাট খাদ্য ও বাসস্থান সংকটে পড়তে হবে আমাদের। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলায় আমাদের আরো সোচ্চার হওয়া জরুরি। বিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই।বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সক্রিয় ডেলটা, যার গঠন প্রক্রিয়া এখনো চলছে। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেই প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এ দেশ। ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস বছরজুড়েই লেগে থাকে। আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে ১৯৭০-এর ১২ নভেম্বর আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ১০ লক্ষাধিক লোকের মৃত্যু হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি আজও মানুষের মনে ও ইতিহাসের পাতায় গেঁথে আছে। বাংলাদেশে এখনো প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস হয়। কিন্তু যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি আগে হতো, এখন গৃহীত পদক্ষেপের কারণে আগের মতো ক্ষয়ক্ষতি হয় না, এ কথা সত্য। তবে ৫০ বছর পর আজ তার পার্থক্য হলো এ রকম দুর্যোগের মাত্রা ও তীব্রতা বেড়েছে বহুলাংশে। এর কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবকে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ ও তার তাত্ত্বিক দিকের আলোচনাটি এখন তুলে রাখতে চাই এজন্য নয় যে এর কোনো গুরুত্ব নেই, বরং এটি যেমন অনেকখানি আমাদের ইচ্ছা, অনিচ্ছা ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তেমনি এর ব্যাখ্যায় অধিকতর বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন এবং তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্ট মহল থেকে করাও হচ্ছে। কারণ যাই হোক আর প্রধান দায়ী যারাই হোক না কেন এর অল্প বিস্তর নেতিবাচক প্রভাব বিশ্বজুড়েই পড়ছে, যা আমাদের দেশে অনেক বেশি প্রখর ও দৃশ্যমান। প্রভাবের দিকটি নিয়ে বলার শুরুতে মনে করাতে চাই যে পৃথিবীর সর্বদক্ষিণের নিম্নভূমিতে অবস্থান বলে বাংলাদেশে দুর্যোগের মাত্রা যেমন অধিকতর, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি, একইভাবে বদলেছে দুর্যোগের ধরন।
সাধারণত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে জীবন ও ফসলহানি, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বাস্তুচ্যুতিসহ বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে ঋতুচক্র বদলে যাচ্ছে, ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে পরিবর্তন, যেমন অধিকতর উষ্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি গ্রীষ্ম, বিলম্বিত ও দীর্ঘায়িত বর্ষা মৌসুমে অতি বা অনাবৃষ্টি, অন্যদিকে প্রায় অনুপস্থিত শরৎ, ক্ষণে ক্ষণে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ সহযোগে স্বল্পমেয়াদের শীত মৌসুম। বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রভাব পড়েছে জল, জঙ্গল ও জমিনে যার মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চল হচ্ছে গভীরতম ক্ষতের জায়গা। ঘন ঘন জলোচ্ছ্বাসে সাগরের নোনা পানি প্রবেশ ও তা লম্বা সময় ধরে আটকে থাকার কারণে জমিতে যেমন লবণাক্ততা বেড়েছে; তেমনি খুলনা, বাগেরহাটসহ দক্ষিণাঞ্চলের অনেক জেলায় প্রকট হয়েছে সুপেয় পানির অভাব। উষ্ণায়ন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে গতানুগতিক চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে, ফলে ব্যাহত হচ্ছে খাদ্য উৎপাদন। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক রকমের ফসল উৎপাদন এখন আর সম্ভব হচ্ছে না।
আবহাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ঋতুচক্রের অস্বাভাবিক বদলের চূড়ান্ত নেতিবাচক প্রভাব সব মানুষের জীবন ও জীবিকায় পড়েছে আর তার খেসারত গুনতে হচ্ছে প্রধানত নারী ও শিশুদের। পরিবারের গৃহস্থালি কাজের জন্য প্রতিদিন সুপেয় পানির প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হচ্ছে নারী ও কন্যাশিশুটিকে। ইউনিসেফের ২০১৩ সালের একটি জরিপে পানি সংগ্রহে নারী-পুরুষের ভূমিকার ভিন্নতা দেখা গেছে। ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশ নারী পরিবারের জন্য পানি সংগ্রহ করেন। অন্যদিকে এ দায়িত্ব পালন করেন মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ। লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে। আইসিডিডিআর,বির এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বলছেন, খাবার পানির সঙ্গে যে পরিমাণ লবণ নারীদের দেহে প্রবেশ করছে তার প্রভাবে দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের গর্ভপাত বেশি হয়। ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এ গবেষণায় দেখা যায়, সমুদ্র উপকূলের ২০ কিলোমিটার এলাকা এবং সমুদ্র তটরেখা থেকে সাত মিটার উচ্চতায় যারা বসবাস করে, তাদের গর্ভপাতের ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে ১ দশমিক ৩ গুণ বেশি। সূত্র: https://www.theprobashi.com/23। এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে যেসব নারী চিংড়ি রেণুপোনা সংগ্রহের কাজ করে তাদেরও প্রজনন স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত লোনা পানির দৈনন্দিন ব্যবহারের ফলে জরায়ুসংক্রান্ত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী নারীরা। সেজন্য অল্প বয়সেই জরায়ু কেটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন এ এলাকার অনেক নারীই। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা করানোর মতো অর্থনৈতিক সচ্ছলতা না থাকার কারণে বেশির ভাগ প্রান্তিক নারী জরায়ু কেটে ফেলাকেই স্থায়ী সমাধান মনে করেছেন। কিন্তু এর ফলে তাদের শারীরিক, মানসিক ও সাংসারিক সমস্যা আরো বেড়ে যাচ্ছে। অনেকের সংসারই ভেঙে যায়।
অন্যদিকে, ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের কারণে নদীভাঙন বেড়েছে। নদী পারের মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে শহরাঞ্চলে গার্মেন্টস ও নির্মাণ শিল্প ইত্যাদি খাতে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন এবং সেখানে তারা আর্থিকভাবে কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও অনেকেই আরেকবার হয়রানির শিকার হচ্ছেন। চাকরি ও সন্তান লালন একই সঙ্গে সম্ভব হয় না বলে গ্রামে নিকটজনের কাছে রেখে পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকছেন। যেটি একদিকে তাকে, আর অন্যদিকে তার পরিবারকে মানসিক কষ্টে রাখে। এছাড়া গ্রামীণ নারী অভিবাসী শ্রমিক হয়ে পাড়ি দিচ্ছেন দূরদেশে। কখনোবা পাচার হয়ে যাচ্ছেন অজানা গন্তব্যে। এর সবগুলোরই একমাত্র কারণ জলবায়ু পরিবর্তন না হলেও অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রধান কারণ হিসেবে এরই মধ্যে চিহ্নিত হয়েছে। এগুলো তাদের এক ধরনের অভিযোজনের বহুমাত্রিক উপায়। বয়সভেদে নারী ও কন্যাশিশুর ওপর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব পড়ে, যেখানে মাধ্যমিক ও উচ্চপর্যায়ের শিক্ষা থেকে কন্যাশিশুর ঝরে পড়া ও বাল্যবিবাহও বাদ পড়েনি।
বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ বাস করে উপকূলে, যাদের জীবিকার প্রধান বা একমাত্র উপাদান হচ্ছে কৃষি। বর্তমানে কৃষি থেকে যে খাদ্যশস্য উৎপাদন হয় তা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এনে দিয়েছে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতে এ ধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। বিশেষত ২০৫০ সালের মধ্যে যে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা আছে, সেটা ৮ শতাংশ এবং গম উৎপাদন কমবে ৩২ শতাংশ। সুতরাং সময় উপযোগী পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না গেলে এখন খাদ্যে যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আছে, আমরা হয়তো তা ধরে রাখতে পারব না। আর তাতে যে নারী ও শিশুরাই অধিক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
এ কথা প্রমাণিত সত্য যে সারা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জীবিকার প্রধান উৎস কৃষি। উপকূল ছাড়া সারা দেশের কৃষিও এ নেতিবাচক প্রভাবের শিকার।
কৃষিশুমারি ২০১৯ অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় মোট ৯৮.৬৬ শতাংশ পরিবার পল্লী এলাকায় বসবাস করে। যার মধ্যে ৫৩.৮২ শতাংশ কৃষি পরিবার। বর্তমানে দেশের মোট শ্রমজীবী মানুষের ৪০.৬ শতাংশ কৃষির সঙ্গে যুক্ত; এদের মধ্যে ৭২.৬ শতাংশ নারী। শ্রম জরিপ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে এসে কৃষিতে নারীর সংশ্লিষ্টতা ৬৮.৮৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭২.৬ শতাংশ হয়েছে। কৃষিতে নারী কৃষকরা যে ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন তা দেশের বিভিন্ন জায়গার উদাহরণ থেকে উল্লেখ করা যায়। নারী কৃষকরা মূলত খাদ্যশস্য উৎপাদন করছেন, জৈব কৃষি চর্চা করছেন। ফলে মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, ভূমির সঠিক ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে। আর এ কৃষি যখন হুমকিতে পড়ে তখন নারীরা বরাবরের মতোই অধিকতর ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভোগেন।
গ্রামীণ নারী কৃষকরা পরিবারের পুষ্টি সরবরাহ করলেও নিজেরাই পুষ্টিহীনতার শিকার। বাংলাদেশে ৫০ শতাংশের বেশি নারীই পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। ফুড সিকিউরিটি নিউট্রিশনাল সার্ভেলেন্স প্রোগ্রামের (এফএসএনএসপি) এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে বয়সের তুলনায় খর্বাকৃতি কিশোরীর হার ৩২ শতাংশ, খর্বাকৃতি নারীর হার ৪২ শতাংশ, খাদ্যে কম পুষ্টি গ্রহণকারী নারীর হার ৬০ শতাংশ। দীর্ঘমেয়াদে শক্তির ঘাটতি আছে এমন নারীর হার ২৫ শতাংশ। এছাড়া দেশের ৪৪ শতাংশ নারী রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি ‘বাংলাদেশের নারী ও শিশুস্বাস্থ্য’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, এ দেশে মায়েদের এক-তৃতীয়াংশ অপুষ্টির শিকার এবং উচ্চতার তুলনায় তাদের ওজন কম। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘পুষ্টি জরিপ-২০১১’তে বলা হয়েছে, এমডিজি বাস্তবায়নকালে বাংলাদেশে খর্বতা, কৃশতা ও কম ওজনসম্পন্ন শিশুদের সংখ্যা কমলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নারীর পুষ্টিহীনতার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ সমন্বিত পুষ্টি প্রকল্প এবং জাতীয় পুষ্টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এসব প্রকল্পের কার্যক্রম সাফল্য পেলেও এখনো আমাদের দেশের বহু নারী পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন।
অঞ্চলভেদে জলবায়ুর প্রভাবে দুর্যোগের ধরন যেমন ভিন্ন, মানুষ ও প্রকৃতিতে তার প্রভাবও ভিন্ন ভিন্ন। ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে নারীদের সঙ্গে দেখা ও আলাপচারিতায় তা উঠে এসেছে।
জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের পার্বত্য তিন জেলার ভূমি, ফসল উৎপাদন ও পানি ব্যবস্থাপনার ব্যাপক পরিবর্তন হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ওই এলাকার নারীরা। এ অঞ্চলের বন উজাড় হওয়ার কারণে পাহাড়ি ছড়াগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে পাহাড়ি নারীদের দূরবর্তী অন্য পাহাড় থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এমনিতেই পাহাড়ি নারীরা পুষ্টিহীনতায় ভোগে, তার ওপর পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথ বেয়ে প্রতিদিন পানি সংগ্রহের কারণে তাদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। আবার তারা নিরাপত্তাহীন চলাচল পথে প্রায়ই ধর্ষণের শিকার হন। এছাড়া বিগত ২০১৭ সালে টানা অতিবর্ষণে ১২ ও ১৩ জুন রাঙামাটি, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানে যে ভূমিধস হয়, এতে কমপক্ষে দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। এছাড়া কাউখালী, কাপ্তাই, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি, রাজস্থলী ও নানিয়ারচরেও ভূমিধস হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পুরো জেলা। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি আদিবাসী নারীরা খেয়ে না খেয়ে কোনো রকমে জীবন ধারণ করেছেন। এমনও হয়েছে যে ধসে পড়া পাহাড়ের মাটি সরাতে আদিবাসী নারীরা নিজেরাই যার যা ছিল তা নিয়ে রাতভর মাটি সরানোর কাজ করেছেন।
এবার আসি হাওড়ের কথায়। কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া অর্থাৎ এ সাতটি জেলার প্রায় ৮.৫৮ লাখ হেক্টর জমি নিয়ে হাওড় অঞ্চল গঠিত। বাংলাদেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ১৬ শতাংশ আসে হাওড় থেকে। গবেষক ড. আবুল বারকাতের গবেষণায় দেখা গেছে, জিডিপির ২ শতাংশ আসে হাওড়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে। হাওড়ে বছরে একবার ফসল (বোরো ধান) হয়। এ সময়ে বছরের ছয়-সাত মাস এলাকায় কাজ থাকে। বাকি সময় মেয়েদের কাজ থাকে না। বছরের পাঁচ-ছয় মাস ঘরে চাল থাকে। বাংলাদেশের বৃহৎ এ হাওড় অঞ্চল এ জলবায়ুর প্রভাবে অকালবন্যায় বাঁধ উপচে বা ভেঙে ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়া, মত্স্যসম্পদ, হাঁস ও আরো অন্যান্য জলজ সম্পদ হারানো এখন অনেকটাই ফিবছরের ঘটনা। অন্যসব জায়গার মতো সেখানেও নারী ও শিশুরাই অধিক দুর্ভোগে থাকে। পানিবন্দি অবস্থায় খাদ্য সংকট, যাতায়াত, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা সবই দুর্লভ হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে জরুরি প্রসূতি সেবার অভাবে অনেক নারীর মৃত্যুও হয়। পানিবাহিত অন্যান্য রোগের দ্রুত চিকিৎসা না পেয়ে শিশুদের মৃত্যু বেড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তারা পুষ্টিহীনতাজনিত অসুখ-বিসুখে ভুগতে থাকে।
বিগত ১৯১৬-১৭ সালে দুই বছর পর পর বন্যা-আগাম বন্যায় হাওড়বাসীর খাদ্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। এ সময়ে স্থানীয় বাজারেও খাদ্য সংকট হয়। অকালবন্যায় বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় কাঁচা ধান। চারদিকে পানি থাকায় কোনো শাকসবজি বা লতাপাতাও ছিল না খাওয়ার মতো। বন্যার কারণে গবাদি পশুও খাবারের অভাবে পানির দামে বিক্রি করতে হয়েছে। হাওড় এলাকার সংকট মোকাবেলায় সরকার পরবর্তী সময়ে পরিবারপ্রতি ৩০ মণ চাল, সঙ্গে নগদ ৫০০ টাকা সহায়তা দিয়েছে। তার বিতরণ ব্যবস্থায় নারীরা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর এলাকার নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল এ ত্রাণ বিতরণে দুজন পুরুষ বা পুরুষপ্রধান পরিবারের বিপরীতে একজন নারী বা নারীপ্রধান পরিবারকে ত্রাণ দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ নারী, পুরুষের অর্ধেক সংখ্যায় ত্রাণ পেয়েছেন, যদিও এটি কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতারই স্থানীয় প্রতিফলন। পরিবারের পুরুষ সদস্য এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় গিয়ে পাথর কোয়ারিতে বালুটানা, পাথরটানার কাজ করছেন। কেউ ভ্যান-রিকশা চালাচ্ছে। সেই বছর একটি বড় সংখ্যায় নারী, পোশাক শ্রমিক হিসেবে ঢাকার গাজীপুর, টঙ্গী, সাভার এলাকায় পাড়ি দেন। যাতায়াত বেড়ে যাওয়ায় সে সময় ঢাকা-সুনামগঞ্জ রুটে বেশিসংখ্যক সরাসরি নাইট কোচ চালু হয়।
এদিকে উদ্বাস্তু হয়ে বর্তমানে ঢাকায় যারা গৃহকর্মী বা নিম্ন আয়ের মানুষ, তাদের বেশির ভাগই এসেছেন জলবায়ুর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, এদের ৫৬ শতাংশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীভাঙনের শিকার। বাকিরা আসছেন উত্তরাঞ্চলের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে। বিগত ২০০৮ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে উদ্বাস্তু হয়েছে দেশের প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ। ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি সাতজনের একজন জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ছোট করে বলতে চাই, যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে নারী ও শিশুরা সব থেকে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
