জনবলসংকটে ধুঁকছে ফেনী সদর হাসপাতাল

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

২৫০ শয্যার বিপরীতে রোগীর চাপ কয়েক গুণ, সেবা দিতে হিমশিম

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফেনী : জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ২৫০ শয্যার ফেনী জেলা সদর হাসপাতালটি শুধু ফেনী নয়, আশপাশের কয়েকটি জেলার মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল। তবে দীর্ঘদিনের জনবলসংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় হাসপাতালটি কার্যত চাপের মুখে রয়েছে।

ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় ফেনীর পাশাপাশি চট্টগ্রামের মীরসরাই ও রামগড়, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম এবং নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ ও সেনবাগসহ আশপাশের এলাকার হাজারো মানুষ প্রতিদিন এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের বড় অংশই দ্রুত চিকিৎসার জন্য এখানে আনা হয়।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ রোগী সেবা নেন। এ ছাড়া অন্তর্বিভাগে ৬০০ থেকে ৭০০ রোগী ভর্তি থাকেন এবং জরুরি বিভাগে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী চিকিৎসা নেন। অন্যান্য বিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে।

কিন্তু এই বিপুল চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। হাসপাতালটিতে ২১ জন কনসালট্যান্টের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ১২ জন। ৪২ জন মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে আছেন ২১ জন। ২০০ জন নার্সের মধ্যে কর্মরত ১৩৩ জন। আর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ১৪৭টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ৫৩ জন।

বিশেষ করে মেডিসিন, শিশু, রেডিওলজি ও সার্জারি বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ শাখায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তীব্র সংকট রয়েছে। জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে আইসিইউ ও কিডনি ডায়ালাইসিস সেবাও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু রাখা যাচ্ছে না। পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও টেকনিশিয়ানের ঘাটতিতে স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং এক্স-রে, ইসিজির মতো পরীক্ষাও ব্যাহত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২৫০ শয্যার এ হাসপাতালে বাস্তবে রোগীর চাপ শয্যার কয়েক গুণ বেশি। এতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রোগীদের ভোগান্তিও বাড়ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ফেনী জেলা শাখার কোষাধ্যক্ষ খোরশেদ আলম বাবলু বলেন, “ফেনীতে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা দীর্ঘদিনের দাবি। চিকিৎসকসংকটের কারণে অনেক গুরুতর রোগীকে ঢাকা বা চট্টগ্রামে পাঠাতে হয়। এতে সময় ও অর্থ—দুটিই অপচয় হয়।”

সুনাগরিক ফোরাম ফেনীর প্রধান সমন্বয়কারী মোর্শেদ হোসেন বলেন, “প্রায় ২৫ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে এই হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক থাকা জরুরি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অনেক পদ শূন্য পড়ে আছে। দ্রুত এসব পদে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।”

ফেনী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ রুবাইয়াত বিন করিম বলেন, “জনবল ও লজিস্টিক সহায়তা বাড়াতে আমরা একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। সীমিত জনবল নিয়েই আমরা সাধ্যমতো রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।”

হাসপাতালের মার্চ মাসের পরিসংখ্যান বলছে, ওই মাসে বহির্বিভাগে ১১ হাজার ৭৭৭ জন, অন্তর্বিভাগে ৫ হাজার ৭৫০ জন এবং জরুরি বিভাগে ৮ হাজার ৭২৩ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এ সময় ১৪৭টি বড় ও ১ হাজার ৫৫৬টি ছোট অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া ৫০১টি স্বাভাবিক প্রসব ও ৮৭টি সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়েছে।

এ ছাড়া হাসপাতালটিতে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস ইউনিট, ১০ শয্যার আইসিইউ এবং ২০ শয্যার এইচডিইউ ইউনিট চালু রয়েছে। তবে ফেনীর প্রায় ২০ লাখ মানুষের তুলনায় এসব সুবিধা অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত শূন্য পদ পূরণ, নতুন পদ সৃষ্টি এবং হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে এ সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।