গা ছমছম সুন্দরবনে জীবন বাজি রেখে চলছে মধু আহরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম : সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে এখন চলছে মধু সংগ্রহের মৌসুম। গাছের মগডালে হাজারো মৌমাছির গুঞ্জন, কাদা-পানিতে ডুবে থাকা পথ আর বাঘের আতঙ্ক—সব মিলিয়ে এ সময়টায় উপকূলের মৌয়ালদের জীবন হয়ে ওঠে এক অনিশ্চিত সংগ্রাম।

প্রতিবছর এপ্রিল থেকে মে–জুন পর্যন্ত সময়কে মধু আহরণের মৌসুম হিসেবে নির্ধারণ করে বন বিভাগ। অনুমতি নিয়ে শত শত নৌকা সুন্দরবনে প্রবেশ করে মধু সংগ্রহে। তবে এই কাজ যেমন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রাণঘাতী ঝুঁকিপূর্ণও।

শ্যামনগর, কয়রা ও সাতক্ষীরা উপকূলের কয়েক হাজার মানুষ বংশপরম্পরায় মধু সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত। স্থানীয়ভাবে তারা ‘মৌয়াল’ নামে পরিচিত।

মৌয়ালরা জানান, মৌচাক খুঁজে পাওয়া, মৌমাছির আক্রমণ সামলানো এবং বনের ভেতরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা—সবই অত্যন্ত কষ্টসাধ্য কাজ।

একজন মৌয়াল বলেন, “বনে ঢুকলে মনে হয় জীবন আর নিজের হাতে নেই। কখনো বাঘ, কখনো ডাকাত—সবসময় ভয় থাকে।”

মধু সংগ্রহের জন্য মৌয়ালরা সাধারণত গামছা, দা, ধোঁয়া তৈরির ‘কাড়ু’ এবং মধু রাখার হাঁড়ি নিয়ে বনে যান। মৌচাক শনাক্ত করার পর শুকনো পাতা জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি করা হয়, যাতে মৌমাছি সরে যায়।

এরপর দক্ষ মৌয়ালরা দা দিয়ে মৌচাকের মধুর অংশ কেটে সংগ্রহ করেন। তবে মৌমাছির বাসা সাধারণত অক্ষত রাখা হয়, যাতে পুনরায় সেখানে চাক তৈরি হতে পারে।

সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে মৌয়ালদের সবচেয়ে বড় ভয় হলো বাঘের আক্রমণ। স্থানীয়রা রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে ‘মামা’ নামে ডাকেন।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছরই মধু আহরণকালে বাঘের আক্রমণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি কুমির, বিষধর সাপ এবং হঠাৎ জোয়ারও বড় ঝুঁকি তৈরি করে।

স্থানীয় মৌয়ালদের অভিযোগ, বনের ভেতরে প্রবেশের আগে ও পরে বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর সঙ্গে ‘চুক্তি’ করতে হয়।

একজন মৌয়াল বলেন, “চুক্তি না করলে বনে ঢোকা যায় না। ধরা পড়লে মুক্তিপণ দিতে হয়।”

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বন বিভাগ বলছে, অনেক সময় ভয়ে কেউ সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয় না।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের এক বন কর্মকর্তা বলেন, “২০১৮ সালের আত্মসমর্পণের পর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও এখন আবার কিছু এলাকায় দস্যুতা দেখা যাচ্ছে। তথ্য পেলে অভিযান চালানো হয়।”

তিনি আরও বলেন, জনবল সংকট এবং বনাঞ্চলের ভৌগোলিক জটিলতা অপরাধ দমনে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশে উৎপাদিত মধুর একটি বড় অংশ আসে সুন্দরবন থেকে। মধুর পাশাপাশি মোমও জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

বন বিভাগ জানায়, এ বছর কয়েক হাজার কুইন্টাল মধু আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঝুঁকি, ভয় আর অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই নতুন করে বনের পথে রওনা হন মৌয়ালরা। তাদের কাছে সুন্দরবন যেমন রোজগারের উৎস, তেমনি এক অনিশ্চিত ভাগ্যের নাম।

একজন প্রবীণ মৌয়াল বলেন, “বনে না গেলে ঘরে চুলো জ্বলে না। ভয় থাকলেও যেতে হয়।”

সুন্দরবনের মধু আহরণ শুধু একটি পেশা নয়—এটি জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর এক নিরব যুদ্ধ। প্রকৃতি, বাঘ, জলদস্যু এবং দারিদ্র্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন জীবন বাজি রাখছেন উপকূলের মানুষরা।