
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও নদীভাঙনে বাড়ছে দুর্যোগের আশঙ্কা
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঝুঁকি বাড়ছে দ্রুতগতিতে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের কারণে উপকূলের প্রায় ৭১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধ এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
সরকারি এক জরিপে উঠে এসেছে, টেকনাফের নাফ নদীর মোহনা থেকে সাতক্ষীরার রায়মঙ্গল–কালিন্দী পর্যন্ত বিস্তৃত এ উপকূলীয় অঞ্চল ক্রমেই অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে সুন্দরবন রয়েছে প্রায় ১২৫ কিলোমিটারজুড়ে, আর বাকি অংশজুড়ে রয়েছে দ্বীপ, মোহনা ও সমতল উপকূলীয় এলাকা।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) পরিচালিত জরিপ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩ সেন্টিমিটার করে পানির স্তর বাড়ছে। এর ফলে উপকূলজুড়ে নদীভাঙন তীব্র হচ্ছে এবং বহু এলাকা ইতিমধ্যে নদী ও সাগরে বিলীন হয়ে গেছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে কক্সবাজার এলাকায় পানির স্তর বেড়েছে ০.২৫ মিটার এবং পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় বেড়েছে ০.৫৭ মিটার। যদিও সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্টে সামান্য হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে। তবুও সামগ্রিকভাবে পানির উচ্চতা বৃদ্ধির প্রবণতা স্পষ্ট।
বিআইডব্লিউটিএর হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মো. আলফাজ উদ্দিন বলেন, “বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে। এর প্রভাব সরাসরি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে পড়ছে, যা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক দশকে উপকূলীয় এলাকায় ভাঙন বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)–এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ সাল থেকে প্রায় ১ হাজার ৭৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১৭ লাখ মানুষ।
জলবায়ুর প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততাও বাড়ছে, যা কৃষি, মিঠা পানির উৎস এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কুয়াকাটা অঞ্চলে ইতিমধ্যে কয়েক কিলোমিটার সৈকত ভেঙে গেছে এবং একাধিক গ্রাম মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
কুয়াকাটা পৌরসভার মেয়র আনোয়ার হাওলাদার বলেন, “আগের তুলনায় এখন সাগরের পানির উচ্চতা ও স্রোত অনেক বেড়েছে। এক যুগ আগে যে সৈকত ছিল, তার বড় অংশ এখন আর নেই।”
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা)–এর স্থানীয় প্রতিনিধি খান এ রাজ বলেন, “গত এক দশকে কুয়াকাটার অন্তত তিন কিলোমিটার উপকূল ভেঙে গেছে। কয়েকটি মৌজা ও গ্রাম ইতিমধ্যে বিলীন হয়েছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করে, যারা প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন। একই সঙ্গে দেশের জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ এ অঞ্চল থেকে আসে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
