
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদ শ্যামনগর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে বসবাসকারী হাজারো মানুষ প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধে লড়াই করছেন। নদী থেকে মাছ ও কাঁকড়া ধরে, ইটভাটায় শ্রম দিয়ে কিংবা দিনমজুরি করে কোনো রকমে সংসার চালান এসব মানুষ। জরিপে দেখা গেছে, উপজেলার পদ্মপুকুর, গাবুরা, রমজাননগর, কৈখালী ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নে ১৫ হাজার ৯৭৬টি পরিবার রয়েছে, যাদের মাসিক আয় সাত হাজার টাকারও নিচে।
মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের চুনকুড়ি নদীর তীরে আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করেন শান্তি রানী মণ্ডল। প্রতিদিন ভোরে নদীতে জাল ফেলে হরিণা চিংড়ি, বেলে মাছসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছ ধরেন তিনি। পরে গ্রামেগঞ্জে ঘুরে সেই মাছ বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে তার সংসার।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মোস্তফা কামাল জানান, শান্তি রানী মণ্ডল অত্যন্ত অসহায় একজন নারী। নদীতে মাছ ধরেই তার সংসার চলে। প্রতিদিন মাছ বিক্রি করে কখনো ৫০ টাকা, কখনো ১০০ বা ১২০ টাকা আয় হয়। সেই টাকায় চাল-ডাল কিনে সংসার চালাতে হয়।
এলাকার অনেক মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে নদীর ওপর। কেউ মাছ ধরে, কেউ কাঁকড়া সংগ্রহ করে আবার কেউ ইটভাটায় কাজ করেন। দিনমজুরির এই আয় দিয়েই চলে তাদের পরিবার।
উপকূলীয় এসব হতদরিদ্র পরিবারকে নিয়ে কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নওয়াবেকী গণমুখী ফাউন্ডেশন (এনজিএফ)। ‘পাথওয়েজ টু প্রসপারিটি ফর এক্সট্রিমলি পুওর পিপল (পিপিইপিপি)’ প্রকল্পের আওতায় পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) অর্থায়নে সংস্থাটি জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে এ তালিকা প্রণয়ন করেছে।
জরিপ অনুযায়ী পদ্মপুকুর ইউনিয়নে ২ হাজার ৩৯৫টি, গাবুরা ইউনিয়নে ৪ হাজার ১৭টি, রমজাননগর ইউনিয়নে ২ হাজার ৫৬০টি, কৈখালী ইউনিয়নে ২ হাজার ৭১৯টি এবং মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নে ৪ হাজার ২৮৫টি পরিবারকে হতদরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রকল্পের টেকনিক্যাল অফিসার (কমিউনিটি মোবিলাইজেশন) অভিজিৎ নন্দী জানান, পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে জরিপটি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—২০ শতকের কম জমি, মাসিক আয় সাত হাজার টাকার নিচে, মাথাপিছু মাসিক আয় ১ হাজার ৮১৫ টাকার কম, পরিবারে প্রতিবন্ধী সদস্য থাকা এবং বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা সদস্য থাকা। এসবের মধ্যে অন্তত তিনটি মানদণ্ড পূরণ হলেই সেই পরিবারকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হবে। এরপর এসব পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে, ফলে অনেক মানুষ জীবিকার জন্য নদী ও বননির্ভর হয়ে পড়ছেন।
উপকূলবাসীর দাবি, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা হলে তাদের জীবনমান উন্নত হতে পারে। অন্যথায় দারিদ্র্য ও দুর্যোগের সঙ্গে তাদের এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
