উপকূলীয় এলাকায় অধিকাংশ মানুষের আয়ের উৎস রেণু সংগ্রহ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৭ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম | সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর উপজেলার সীমান্তবর্তী উপকূলীয় এলাকায় অধিকাংশ মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভর করছে চিংড়ির রেণু সংগ্রহের ওপর। স্থানীয়দের ভাষায়, নদীতে রেণু না থাকলে এই এলাকার বহু পরিবার কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়ে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সীমান্তবর্তী ভেড়িবাঁধ ও নদীতীরবর্তী এলাকায় নারী–পুরুষ ও শিশুরা নৌকা, নেটজাল ও দড়ি নিয়ে প্রতিদিন নদীতে নেমে পড়ছেন। তারা বাগদা, গলদা ও হরিনা চিংড়ির রেণু সংগ্রহ করে স্থানীয় আড়তদার বা ঘেরমালিকদের কাছে বিক্রি করছেন। অনেকের সংসার চলে এই আয়েই।

উকসা গ্রামের বাবর আলী মণ্ডল, হরিদাস পাল ও ইব্রাহিম হোসেন বলেন, জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়েই নদীতে নামতে হয়। একদিকে সীমান্তের কড়াকড়ি, অন্যদিকে কুমির ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সবকিছুর মধ্যেই রেণু ধরতে হয়।

স্থানীয় আড়তদাররা জানান, বর্তমানে এক হাজার বাগদা রেণু বিক্রি হচ্ছে ১,২০০ থেকে ১,৩০০ টাকায়। গলদা রেণু হাজারপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ১৭ থেকে ১৮শ টাকায়। প্রতিদিন একজন সংগ্রাহক গড়ে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকার রেণু সংগ্রহ করতে পারেন।

তবে রেণু সংগ্রহ পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একটি চিংড়ির রেণু ধরতে গিয়ে অসংখ্য অন্যান্য মাছের পোনা ও জলজ প্রাণী ধ্বংস হচ্ছে। এতে নদী ও সাগরের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।

সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা প্রফুল্ল কুমার রায় বলেন, একটি চিংড়ির রেণু আহরণের বিপরীতে শতাধিক অন্য প্রজাতির মাছের পোনা নষ্ট হয়। এতে দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আইন অনুযায়ী চিংড়ির রেণু আহরণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে তা বন্ধ করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপকূলীয় এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবই এর মূল কারণ।

পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা মনে করেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়—রেণু সংগ্রহে জড়িত দরিদ্র মানুষদের বিকল্প আয়ের সুযোগ ও প্রশিক্ষণ না দিলে এই সংকট সমাধান হবে না।

মৎস্য বিভাগ জানায়, রেণু সংগ্রহ বন্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে জনবল সংকট ও ব্যাপক অংশগ্রহণের কারণে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না।

উপকূলবাসীর জীবন ও জীবিকার বাস্তবতা এবং মৎস্যসম্পদ রক্ষার চ্যালেঞ্জ—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে রেণু সংগ্রহ আজ উপকূলীয় জনপদের বড় বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।