
নড়বড়ে বাঁধ–দুর্যোগ–যোগাযোগ সংকটে গাবুরার মানুষের জীবন দুর্বিষহ
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : নদী আর সাগরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা উপকূলীয় জনপদ গাবুরা ইউনিয়ন—সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ‘দ্বীপ ইউনিয়ন’ নামে পরিচিত এই এলাকার মানুষ এখনো বেঁচে আছেন ভয় ও অনিশ্চয়তার ওপর ভর করে। চিকিৎসা, শিক্ষা, যোগাযোগ—কোনো মৌলিক সুবিধাই ঠিকমতো না থাকায় এখানে একজন রোগীকে হাসপাতালে নিতে সময় লাগে তিন ঘণ্টারও বেশি। পথে পথে মৃত্যুর ঘটনা তাই এখানে খুব সাধারণ খবর।
ষাটের দশকে নির্মিত বেড়িবাঁধ আর টিকছে না উপকূলের বাড়তি চাপ। আম্পান, আইলা, সিডর, ফণী—একটি ঘূর্ণিঝড় আসলেই বাঁধের দুর্বলতা চোখে পড়ে। বহু অংশ জোড়াতালি দিয়ে চলছে, অনেক জায়গায় আবার নতুন ভাঙন। ভারী বৃষ্টিতে বা অস্বাভাবিক জোয়ারে প্রায়ই ভেঙে প্লাবিত হয় উপকূলীয় এলাকা। ডুবে যায় ফসলের জমি, পুকুর, মাছের ঘের, বসতভিটা।
সরকারের হিসাবে দেশের ১৯ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলে রয়েছে প্রায় অর্ধেক। শুধু খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাতেই ২ হাজার ৬ কিলোমিটার বাঁধ। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাঁধগুলো এখন ঝুঁকিপূর্ণ। সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনিতে নতুন ভাঙন দেখা দিয়েছে ২৯টি পয়েন্টে।
গাবুরা থেকে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। নদীপথই একমাত্র ভরসা। অনেক সময় রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই প্রাণ হারান। সোরা গ্রামের মুরশিদ আলী বলেন, ‘এখানে হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে আল্লাহ ভরসা ছাড়া উপায় থাকে না। জীবন-মৃত্যুর মাঝেই পথ পাড়ি দিতে হয়।’
চাঁদনিমুখার খায়রুল ইসলাম তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে সময়মতো চিকিৎসা করাতে পারেননি। শ্যামনগর থেকে সাতক্ষীরা, সেখান থেকে খুলনা—রেফার্ড হতে হতে সন্তানকে আর বাঁচানো যায়নি। খায়রুলের কথায়, ‘রাস্তা নেই, নৌকায় তিন ঘণ্টার পথ। ভাবতেই কাঁপে মন। এখানে একটা হাসপাতাল হলে কত জীবন বাঁচত।’
আজিজুল ইসলামের গল্প আরও কষ্টের। আম্পানের পর দোকান মেরামতের সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। খুলনায় পৌঁছাতে সময় লাগে পাঁচ ঘণ্টা। চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন প্যারালাইজড।
স্থানীয়রা বলছেন, তারা এখনো খাদ্য, পানি, শিক্ষা, চিকিৎসা—কোনোটিরই নিশ্চিত সুবিধা পান না। ব্যবসায়ী খালিদ হাসান বলেন, ‘আমরা সব দিক থেকে বঞ্চিত। ন্যূনতম সেবাও পাই না। এখানে কোনো উন্নয়ন হয় না।’
জিয়াউর রহমান ২০০৯ সালের আইলার পর নিজের এক বিঘা জমি ফেলে গাবুরা ছেড়ে চলে গেছেন অন্য ইউনিয়নে। তার ভাষায়, ‘ওখানে বসবাসই অনুপযোগী। পানি নেই, রাস্তা নেই, চিকিৎসা নেই—বাঁধ ভাঙলেই ঘর ভেসে যায়।’
গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলম জানান, ইউনিয়নের ৫০ হাজার মানুষের জন্য আছে মাত্র চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক। তাও সর্দি-কাশির চিকিৎসার বাইরে কিছুই পাওয়া যায় না। এমবিবিএস চিকিৎসক নেই। তিনি বলেন, ‘অনেকেই চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে না পেরে মারা গেছেন। নৌকার ওপর ভরসা করে বাঁচতে হয়।’
একটি এনজিও—‘ব্রতি’—ট্রলারভিত্তিক চিকিৎসাসেবা চালু করেছে। চেয়ারম্যান এতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেও বলেন, “সরকারি উদ্যোগ ছাড়া এই সেবা টিকবে না।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, তদারকির অভাব এবং বছরে কয়েক মাসের ‘জরুরি কাজের’ নামে বাঁধ মেরামতে তড়িঘড়ির কারণে কাজের মান থাকে না। ৬ মাস ধরে মাটি ভরাট করে যে শক্ত বাঁধ তৈরি হওয়ার কথা ছিল, এখন তা ৯০ দিনের টেন্ডারে সেরে ফেলায় বাঁধ টেকসই হচ্ছে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের জনবল সংকটও বড় প্রতিবন্ধকতা। অনেক জায়গায় বাঁধের ঢালে বাসাবাড়ি, গাছপালা লাগানো—সব মিলিয়ে বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন বলেন, ‘গাবুরার ভৌগোলিক অবস্থান খুব কঠিন। হাসপাতাল করা সম্ভব হয়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই বলে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বেশি।’ তবে তিনি জানান, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো প্রাথমিক সেবা দিচ্ছে এবং রোগীদের অন্যান্য হাসপাতালে রেফার্ড করা হচ্ছে।
উপকূলীয় অঞ্চল বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি। কিন্তু নাজুক বেড়িবাঁধ, যোগাযোগহীনতা, দুর্যোগ আর অবহেলার মধ্যে আটকে থাকায় গাবুরার মানুষ যেন ভুলে যাওয়া নাগরিক।
তাদের একটাই দাবি— টেকসই বেড়িবাঁধ, স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা। একটি হাসপাতাল হলে শুধু রোগীই নয়, বাঁচবে হাজারো পরিবারের ভবিষ্যৎও।
