

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : আসছে ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মৌসুম। এপ্রিল থেকে বৈশাখের মাঝামাঝি পর্যন্ত উপকূলে ঝড়ের আশঙ্কা থাকায় সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে আবারও বেড়েছে উদ্বেগ। শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার নদীপাড়ের মানুষের মনে এখন একটাই ভয়—বাঁধ ভেঙে যাবে না তো?
ঝুঁকিতে রয়েছে উপকূলজুড়ে থাকা অধিকাংশ বেড়িবাঁধ। বিশেষ করে শ্যামনগরের গাবুরা, মুন্সিগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী, আটুলিয়া, কাশিমাড়ী, পদ্মপুকুর, রমজননগর ও কৈখালীর বাঁধগুলো এখন নাজুক অবস্থায়। এর মধ্যে গাবুরা ইউনিয়নের গাবুরা-২, গাবুরা-৩ ও লেবুবুনিয়া পয়েন্ট সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তবে আশার খবর—বাঁধ নির্মাণ ও পুনর্বাসনের জন্য সরকারের ১ হাজার ২০ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে। এই প্রকল্প সম্পন্ন হলে প্রায় ২৯ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিমুক্ত হবে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা জেলায় মোট ৬৭৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ৩৩ কিলোমিটার বর্তমানে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। ষাটের দশকে নির্মিত এসব বাঁধ এখন অনেক জায়গায় অর্ধেক উচ্চতা ও প্রস্থ হারিয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় বাঁধগুলো দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা হারিয়েছে।
শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলম বলেন, “চারদিকে নদী দিয়ে ঘেরা গাবুরা ইউনিয়ন। সামান্য ঝড়-বৃষ্টি হলেই কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর পানি বেড়ে বাঁধের উপর দিয়ে উঠে যায়। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হলে মানুষ কিছুটা হলেও নিরাপদ হবে।”
উপকূলবাসী জানাচ্ছেন, আগের বছরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকেই এখন তাদের আতঙ্ক। গাবুরার নুরজাহান খাতুন বলেন, “আমরা নদীর চরে থাকি। প্রতি বছর মে মাস এলেই ভয় লাগে। ঘর ভেঙে যায়, আবার কষ্ট করে বানাই।”
বিছট গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হাকিম মোড়ল বলেন, “খোলপেটুয়া নদীর জোয়ারে সামান্য বাতাস উঠলেই বাঁধ ভাঙে। ঈদের দিনও প্লাবিত হয়েছিল সাতটি গ্রাম। এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে তিনটি পয়েন্ট। কাজ শুরু হলেও বন্ধ হয়ে গেছে।”
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড–১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সালাউদ্দিন বলেন, “আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ৩৮০ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে সাত কিলোমিটার অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। ১ হাজার ২০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পে কাজ চলছে। ইতিমধ্যে ২০ শতাংশ শেষ হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “যদি বড় কোনো দুর্যোগ না আসে, বাঁধ ভাঙার সম্ভাবনা নেই। আমাদের কাছে ৭৫টি জিও টিউব, ৭৫ হাজার জিও ব্যাগ, জিও ফিল্টার ও জি-পলেস্টার মজুত আছে—যাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।”
পাউবো–২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আশিকুর রহমান জানান, তাদের আওতাধীন ২৯৩ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
ঘূর্ণিঝড় রেমাল (২০২৪), মোখা (২০২৩), ইয়াস (২০২১), আম্ফান (২০২০), ফণী (২০১৯) —প্রায় প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ে সাতক্ষীরা ও খুলনার উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বাঁধ ভেঙে ঘরবাড়ি, ফসল ও চিংড়িঘের ডুবে গেছে বারবার।
উপকূলবাসী প্রসাদ মণ্ডল বলেন, “মে মাস এলেই ভয় ধরে। সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিতে হয়। জোয়ারের পানিতে ঘরের মালপত্র ভেসে যায়।”
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর বলেন, “উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে টেকসই বাঁধ নির্মাণে সরকার আন্তরিক। গাবুরাসহ ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হলে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাবেন স্থানীয়রা।”
প্রধান কার্যালয়ঃ মহা সি.এন.জি ভবন সংলগ্ন (৪র্থ তলা), ঢাকা- ময়মনসিংহ রোড, মাওনা চৌরাস্তা, শ্রীপুর, গাজীপুর।
মোবাইলঃ ০১৫৩১-১৭২৭৫০ , ইমেইলঃ dbhorerpatrika.com
ওয়েবসাইটঃ www.bhorerpatrika.com বিজ্ঞাপনঃ ০১৩০৫-৯৫০৬২৫ ইমেইলঃ info@bhorerpatrika.com