
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা: অগ্রিম পাঁচ মাসের জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকাসহ সাতক্ষীরার লাখো মানুষ চরম পানিবন্দী জীবন পার করছেন। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্টি হওয়া এই জলাবদ্ধতার কারণে ঘর থেকে বের হতে পারছেন না হাজার হাজার মানুষ। গত কয়েক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে সাতক্ষীরা পৌরসভাসহ সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। এতে ভেঙে পড়েছে স্যানিটেশন ব্যবস্থা, তলিয়ে গেছে বাড়িঘর এবং ছড়িয়ে পড়েছে পানিবাহিত নানা রোগ। ভুক্তভোগীরা পৌর এলাকার অচল ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও শহরতলীতে অপরিকল্পিত মাছের ঘেরকে এই জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করছেন।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, ১ জুলাই থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত জেলায় প্রায় ৪৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে চলতি মাসের বিভিন্ন দিনে রেকর্ড পরিমাণ ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে।
খুলনা বিভাগের প্রথম পৌরসভা সাতক্ষীরার কামালনগর, ইটাগাছা, মধুমোল্যারডাঙ্গী, বদ্দীপুর কলোনী, মধ্যকাটিয়া, রইচপুর, রাজারবাগান, পুরাতন সাতক্ষীরাসহ সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় কোমরসমান পানি জমে গেছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। পানিতে ডুবে যাওয়া ঘরবাড়িতে রান্নাবান্না করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি সাপ ও পোকামাকড়ের উপদ্রবে বাড়ছে তীব্র আতঙ্ক। রাস্তাঘাট জলমগ্ন থাকায় অনেক এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
বদ্দীপুর কলোনীর জাহেদা খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা এক যুগ ধরে এ অবস্থায় আছি। বৃষ্টি হলেই আমাদের এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। রান্না করা যায় না, ছেলে-মেয়েরাও স্কুল-কলেজে যেতে পারে না। প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মধ্যে বসবাস করেও আমরা ন্যূনতম নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত।”
রইচপুর এলাকার রাহিনুর রহমান বলেন, “বৃষ্টির পানি সরছে না বললেই চলে। রইচপুরের নিচের দিকে অনেকগুলো মাছের ঘের থাকায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন জমা থাকা এই পানি এখন বিষাক্ত হয়ে উঠেছে, যার ফলে ঘরে ঘরে চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়েছে।”
মধ্যকাটিয়া এলাকার আমেনা খাতুন জানান, রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে থাকায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীসহ শিক্ষার্থীরা চরম বিপাকে পড়েছে। পড়াশোনার ভালো পরিবেশের আশায় মানুষ গ্রামে থেকে শহরে এসে বসবাস করলেও জলাবদ্ধতার কারণে ঘর থেকেই বের হতে পারছেন না তাঁরা।
নাগরিক অধিকার উন্নয়ন কমিটির সহ-সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা বলেন, “শহরের মধ্যে বিধিবহির্ভূত ভবন নির্মাণ এবং শহরতলীতে যত্রতত্র মাছের ঘের তৈরি করা জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ। রসুলপুর ও কামালনগরসহ বিভিন্ন এলাকার খালগুলো গভীর করা এবং পানি আটকে রাখা মাছের ঘের ও নেট-পাটা অবিলম্বে অপসারণ করা জরুরি।”
উদ্যোগ ও প্রশাসনের পদক্ষেপ: পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্প্রতি সাতক্ষীরা শহরের বাইপাস সড়ক সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী খালে অবৈধ নেট-পাটা ও বাঁধ অপসারণে বিশেষ উচ্ছেদ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মিসেস কাউসার আজিজের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে জেলা প্রশাসন, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যেমন—বিডি ক্লিন সাতক্ষীরা, ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ (ভিবিডি) এবং রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তরুণরা অংশ নেন। জেলা প্রশাসক হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত জানান, পৌরসভাসহ সদর উপজেলার জলাবদ্ধতা নিরসনে পরিকল্পনা গ্রহণ করে কাজ চলছে। বিশেষ করে বদ্দীপুর কলোনীর জলাবদ্ধতা দূর করতে কুলুবোল্লার খালের চর খনন এবং কামালনগর খালের পানি প্রবাহ ঠিক করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
অন্যান্য খাতের ক্ষয়ক্ষতি: অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে শিক্ষা ও কৃষিখাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রুহুল আমিন জানান, জেলার ৬৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। এর মধ্যে আশাশুনিতে ২০টি, কলারোয়ায় ১০টি, তালায় ১টি, শ্যামনগরে ১২টি এবং সদর উপজেলায় ২০টি স্কুল রয়েছে। অনেক স্কুলের চেয়ার-টেবিল ও মাঠ পানিতে ডুবে থাকায় কষ্ট করে ক্লাস পরিচালনা করতে হচ্ছে। সদর উপজেলার বাগডাঙ্গি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
এদিকে, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি. এম. সেলিম জানান, বৃষ্টির পানিতে দুই শতাধিক মাছের ঘের ভেসে গিয়ে প্রায় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান, জেলার প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান ও কিছু সবজি খেত পচে নষ্ট হয়ে গেছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, বেতনা ও মরিচ্চাপ নদী এবং প্রাণসায়ের খালের নব্যতা ফিরিয়ে না আনলে এবং অপরিকল্পিত মাছের ঘের ও অবৈধ দখলদারদের স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ না করলে উপকূলীয় এই জেলার মানুষের দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা সংকট নিরসন সম্ভব নয়।
