
চিংড়ির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নতুন আশার খোঁজে চাষিরা
সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) : সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় কাঁকড়া চাষে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন উপকূলের মানুষ। একসময় যে অঞ্চলে চিংড়ি চাষ ছিল প্রধান জীবিকা, সেখানে এখন ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে কাঁকড়া। স্বল্প বিনিয়োগে বেশি লাভ, কম ঝুঁকি এবং রপ্তানির সম্ভাবনায় কাঁকড়া চাষে ‘বাজিমাত’ করছেন অনেক চাষি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় চিংড়ি চাষে লাভবান হলেও ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ভাইরাসজনিত রোগে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন চাষিরা। ফলে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে পড়েন। সেই হতাশা কাটিয়ে উঠতে এখন কাঁকড়া চাষে ঝুঁকছেন তারা।
শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ, দেবহাটা ও তালা উপজেলায় ব্যাপকভাবে কাঁকড়া চাষ হচ্ছে। এসব এলাকায় মূলত ‘ফ্যাটেনিং’ বা মোটাতাজাকরণ পদ্ধতিতে কাঁকড়া চাষ করা হয়।
চাষিরা জানান, ছোট কাঁকড়া প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় কিনে এনে তিন মাস লালন-পালন করলে তা ৪০০ থেকে ৬০০ গ্রাম পর্যন্ত ওজন হয়। পরে প্রতি কেজি ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়।
মুন্সিগঞ্জ এলাকার চাষি রাম কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, “১০ কাঠা জমিতে কাঁকড়া চাষ করে পরিবারের পাঁচ সদস্যের খরচ চালাচ্ছি, ছেলেদের পড়াশোনাও চলছে। এখন এটি আমাদের প্রধান আয়ের উৎস।”
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের তরুণ চাষি হান্নান বলেন, “স্নাতক শেষ করেও চাকরি না পেয়ে হতাশ ছিলাম। এখন চার বন্ধু মিলে কাঁকড়া চাষ করছি। প্রথমবারেই ভালো লাভ হয়েছে।”
স্থানীয়দের মতে, কাঁকড়া চাষে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি এনেছে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কাঁকড়া ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে সুপরিচিত। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এসব কাঁকড়া রপ্তানি হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময় কাঁকড়ার বাজার সবচেয়ে বেশি জমজমাট থাকে। শীত মৌসুমে মাদি কাঁকড়ার চাহিদা বাড়ে।
আগে কাঁকড়ার পোনা বা ‘ক্রাবলেট’ সুন্দরবন থেকে সংগ্রহ করতে হতো। এখন স্থানীয়ভাবে পোনা উৎপাদনের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। শ্যামনগরে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা পরীক্ষামূলকভাবে কাঁকড়ার বাচ্চা উৎপাদনে সফল হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি মা কাঁকড়া থেকে ২০ হাজারের বেশি বাচ্চা পাওয়া সম্ভব। এতে ভবিষ্যতে পোনার সংকট অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ ও বুড়িগোয়ালিনী এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, রাস্তার দুই পাশে বিস্তীর্ণ জমিতে গড়ে উঠেছে কাঁকড়ার ঘের। স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসে এখানে বিনিয়োগ করছেন।
কাঁকড়া চাষকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ডিপো, সংরক্ষণ কেন্দ্র ও বিপণন ব্যবস্থা। এতে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
চাষিরা বলছেন, সঠিক প্রশিক্ষণ, পোনা উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সরকারি সহায়তা পেলে কাঁকড়া চাষ উপকূলীয় অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী খাতে পরিণত হতে পারে।
তাদের ভাষায়, “চিংড়ির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কাঁকড়াই এখন সবচেয়ে বড় ভরসা।”
