
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা: বাংলাদেশ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে স্বীকৃত। দেশের অনন্য ভৌগোলিক অবস্থা, প্লাবনভূমি, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নিম্ন উচ্চতা, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং কৃষিনির্ভর জীবনধারা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েক লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
উপকূল ও চরাঞ্চলের মানুষ কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক জীবিকা পরিচালনা করেন। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে বন্যা, নদীভাঙন, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টি ও পানির ঘাটতির কারণে ফসল ও উপকূলীয় জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গোষ্ঠীভিত্তিক অভিযোজন (Community-Based Adaptation – CBA) কার্যক্রম বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ সরকার ‘জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা’ (National Adaptation Plan – NAP) চূড়ান্তকরণ প্রক্রিয়াধীন। স্থানীয় জনগণের সহজাত জ্ঞান, আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য একত্রিত করে স্থানীয় অভিযোজন মডেল তৈরি করলে ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। স্থানীয় ভূচিত্র, বনজঙ্গল, নদী-নালা সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করাও অপরিহার্য।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ কোটি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের মাত্র ১ মিটার বৃদ্ধি হলে খুলনা বিভাগ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ঢাকা অঞ্চলের ১৪ শতাংশ জমি প্লাবিত হবে। ২১০০ সালে বাংলাদেশে জিডিপির ৯.৪ শতাংশ ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে, তবে সঠিক অভিযোজন ও প্রস্তুতির মাধ্যমে এটি ২ শতাংশ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের জন্য দুই ধরনের পদক্ষেপ অপরিহার্য:
১. বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা।
২. উন্নত দেশগুলো থেকে প্রদত্ত জলবায়ু তহবিল এবং প্রযুক্তি যথাযথভাবে ব্যবহার করা।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ধানের উৎপাদন ২৩ শতাংশ কমে যেতে পারে, সমুদ্রপৃষ্ঠের ১ মিটার বৃদ্ধি হলে ৯.৫ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং জ্বালানি ও পানির চাহিদা দ্বিগুণ হতে পারে। দেশীয় উদ্যোগে লবণ সহিষ্ণু ফসল, ঘাত সহিষ্ণু প্রাণি ও নতুন প্রযুক্তি দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করা সম্ভব।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ঝুঁকি এবং ক্ষতির জন্য বাংলাদেশের অবদান নগণ্য হলেও ক্ষতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে। তাই বৈশ্বিক সম্মেলনে (COP-27) বাংলাদেশকে জোরালো অবস্থান নিয়ে জলবায়ু তহবিল ও অভিযোজন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে।
