উপকূলে উন্নয়ন বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম সাতক্ষীরা প্রতিনিধি।গ্রামে লেগেছে শহরের ছোঁয়া। গ্রামগুলোতে বিরাজ করছে শহুরে আবেশ। ঘরে ঘরে জ্বলছে বিদ্যুতের বাতি গ্রামে গ্রামে চলছে ভ্যান রিক্সা কার্পেটিং রাস্তায়। মাটির রাস্তার পরিবর্তে পিচঢালা পাকা রাস্তা, গ্রামের রাস্তার দুধারে শহরের মতো জ্বলে সড়ক বাতি, ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো, খেয়াঘাটের পরিবর্তে ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন গ্রামীন জনজীবনে এনে দিয়েছে অন্য রকম পরিবর্তন। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে ‘দূর’ হয়েছে ‘নিকট’। বদলে গেছে চিরচেনা গ্রামের দৃশ্য। গ্রামে মাটির দেয়ালে গাঁথা জোড় বাংলাঘর এখন আর দেখা মেলে না। দেখা মেলে না গোলপাতায় কিংবা খড়ে ছাওয়া মাটিরঘর। বাড়ির সামনে সেই বৈঠকখানাও এখন বিলুপ্ত। চিরচেনা গ্রামও এখন অচেনা লাগে। শান্তির নীড় হিসেবে বহুল পরিচিত মাটির ঘরের স্থান দখল করেছে ইট-পাথরের উঁচু দালান-কোঠা। গরিবের এসি বলে সুপরিচিত মাটির দেয়ালে গাঁথা বাংলাঘর এখন বিলুপ্তির পথে। সাতচালা কিংবা আটচালা মাটির বাংলাঘর এখন আর নজরে পড়ে না।

আধুনিকতার ছোঁয়া আর কালের আবর্তে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘর এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাঁচার পাশাপাশি তীব্র গরম ও কনকনে শীতে আদর্শ বসবাস-উপযোগী মাটির তৈরি এসব ঘর আগের মতো এখন আর তেমন একটা নজরে পড়ে না।

সাতক্ষীরার প্রবীন সাংবাদিক ও নাগরিক নেতা অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী বলেন, আশির দশকেও গ্রামে কাচা ঘরবাড়ি দেখা যেত। নব্বইয়ের দশকেও অতীতের সাক্ষী হিসেবে গ্রামে দেখা যেত জোড় বাংলাঘর।

সাতক্ষীরা জেলার ৭৮টি ইউনিয়নের প্রত্যেক গ্রামে মাটির ঘর ছিল। ইট-পাথরের তৈরি পাকা দালানের সংখ্যা ছিল গ্রামে হাতেগোনা। সেই দিন বদলে গেছে। এখন হাতেগোনা দু’একটি মাটিরঘর দেখা যায়। অধিকাংশ বাড়ি এখন ইট পাথরের তৈরি।

জানা যায়, এঁটেল মাটি কাদায় পরিণত করে দুই-তিন ফুট চওড়া করে দেয়াল তৈরি করা হত। ১০-১৫ ফুট উঁচু দেয়ালের উপর কাঠ বা বাঁশের চাল তৈরি করে খড়-কুটা, গোলপাতা, টালী, অথবা ঢেউটিন দিয়ে ছাওয়া হতো।

মাটি কুপিয়ে ও পানি দিয়ে কাদায় পরিণত করার পদ্ধতিকে স্থানীয় ভাষায় ‘জাব’ বলা হয়। ‘জাব’ কেটে তা সুচারুভাবে গেঁথে ভাজে ভাজে তৈরি করতে হয় দেয়াল। দেয়ালের একেকটি ভাজের পুরুত্ব তিন থেকে চার ফুট। এভাবে পাঁচ থেকে ছয়টি ভাজ শেষ হবার পর দেয়ালের উচ্চতা দাঁড়ায় ১৫-১৮ ফুট। যিনি মাটির চাপ গেঁথে দেয়াল ও বাঁশ দিয়ে চাল তৈরি করেন তাকে ‘ঘরামি’ বলা হয়।

ঘরের বারান্দা ও চালের ধরণের উপর ভিত্তি করে ঘর বিভিন্নভাবে তৈরি হয়। চারপাশে বারান্দা বিশিষ্ট ঘরকে ‘আটচালা’ এবং তিনপাশে বারান্দা বিশিষ্ট ঘরকে ‘সাতচালা’ ঘর বলা হয়। গৃহিণীরা মাটির দেয়ালে বিভিন্ন রকমের আলপনা এঁকে ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতেন। শৈল্পিক আলপনায় ফুটে উঠতো নিপুণ কারুকার্য।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বর্ষা মৌসুমে মাটির ঘরের ক্ষতি হয় বলে ইট-সিমেন্টের ঘর নির্মাণে এখন উৎসাহী হচ্ছে মানুষ। এক সময় সাতক্ষীরার বিভিন্ন গ্রামে অনেক পরিবার মাটির ঘরে বাস করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও প্রবল বর্ষণে মাটির ঘরের ক্ষতি হয় বলে এখন কাচা ঘর ফেলে পাকাঘর নির্মাণের দিকে ঝুঁকছেন বেশি।

কবি ও সাহিত্যিক সৌহার্দ সিরাজ বলেন, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে ‘দূর’ হয়েছে ‘নিকট’। বদলে গেছে চিরচেনা গ্রামের দৃশ্য। গ্রামে মাটির দেয়ালে গাঁথা জোড় বাংলাঘর এখন আর দেখা মেলে না। দেখা মেলে না গোলপাতায় কিংবা খড়ে ছাওয়া মাটিরঘর। বাড়ির সামনে সেই বৈঠকখানাও এখন বিলুপ্ত। চিরচেনা গ্রামও এখন অচেনা লাগে। শান্তির নীড় হিসেবে বহুল পরিচিত মাটির ঘরের স্থান দখল করেছে ইট-পাথরের উঁচু দালান-কোঠা। ভূমিকম্প বা বন্যা না হলে একটি মাটির ঘর শত বছরেরও বেশি স্থায়ী হয়। কিন্তু কালের আবর্তে দালান-কোঠা আর অট্টালিকার কাছে হার মানছে মাটির দেয়ালে গাঁথা জোড় বাংলা ঘর। ইট-পাথরের নগরীতে এমনই বিলুপ্তপ্রায় মাটির তৈরি ঘর দেখলে মনে হয়-‘আমি তো এসেছি আউল বাউল মাটির দেউল থেকে।

এক সময় যাদের গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গোরু আর পুকুর ভরা মাছ ছিলো তারাই এখন নদী ভাঙ্গনে সর্বস্বান্ত হয়ে ঠাঁই নিয়েছেন রাজধানী ঢাকা শহর অথবা বিভাগীয় কোনো বড় শহরের বস্তিতে। বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলের কোটি মানুষের সারা বছর ভালো কাটলেও বর্ষাকাল এলেই নদী ভাঙ্গন নিয়ে উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে প্রতি বছর এ অঞ্চলের লাখ-লাখ পরিবার গৃহহীন, প্রাণহানি ও নিখোঁজের শিকার হচ্ছেন। নদী ভাঙ্গনের ঘটনাও রয়েছে অসংখ্য। ভূমিহীন এসব পরিবারগুলো বেড়িবাঁধের ওপর আশ্রয় নেয়া ছাড়াও জীবন-জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছে ঢাকা কিংবা বড় কোন বিভাগীয় শহরগুলোতে। তাদের কাছে উপকূলে বসবাস করা মানেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে জীবনযুদ্ধে সামিল হওয়া।

বিশেষ এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলের অব্যাহত নদী ভাঙ্গনের ফলে বিলীন হয়ে গেছে শতাধিক গ্রাম। যে কারণে ক্রমেই বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের স্থল ভাগের মানচিত্র ছোট হয়ে পাল্টে যাচ্ছে। আর এখনও দক্ষিণাঞ্চলের ভয়ঙ্কর ১৫টি নদীর সাথে যুদ্ধ করে কোনো মতে বেঁচে আছের নদীর তীরবর্তী কোটি মানুষ। নদী ভাঙ্গনের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখা গেছে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলের ১৫টি নদীর কড়াল গ্রাসে বিলীন হয়ে গেছে শতাধিক গ্রাম। গৃহহারা হয়েছে কয়েক লাখ পরিবার। গ্রাম্য প্রবাদ মতে, ‘ঘর পুড়লে ভিটেমাটি টুকু থাকে কিন্তু নদী ভাঙ্গনে কিছুই থাকে না’। এমনকি পূর্ব পুরুষের কবর জিয়ারতের সুযোগটি পর্যন্ত পায় না ভাঙ্গন কবলিত মানুষেরা। বাড়ি-ঘরের সাথে গাছপালা আর পারিবারিক গোরস্থানও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। খোদ বরিশাল নগরী সংলগ্ন চরবাড়িয়া  চরমোনাই, চরকাউয়া, চরআইচা ও চরবাড়িয়ার  পূব পাশে চর আবদানীর গ্রামের  অব্যাহত ভাঙ্গনে ইতোমধ্যে বিপুল সংখ্যাক স্কুল , ইটেরভাটাসহ কয়েক হাজার ঘরবাড়ি , কীর্তনখোলা নদী গ্রাস করে নিয়েছে। কীর্তনখোলার অব্যাহত ভাঙ্গনে ইতোমধ্যে চরবাড়িয়া ইউনিয়নের ও চর আবদানী গ্রামের নতুনচর ও চর পশুরীকাটি  সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে কীর্তনখোলার ভাঙ্গনের কবলে রয়েছে ১৩১ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে বিদ্যালয়ের পাশে থাকা আয়নার প্যাদা জামে মসজিদসহ অসংখ্য স্থাপনা ও গ্রামবাসীর ফসলি জমি।

সরেজমিনে দেখা যায়, পৃর্ব চর আবদানীর এলাকার ১৩১ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যাতায়াত ও গ্রামবাসীর চলাচলের  সড়কটির তিন কিলোমিটার এবং শতাধিক পরিবারের বসত ঘর ইতোমধ্যে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। চর আবদানীর গ্রামের বৃহৎ এলাকা নদী গ্রাস করে নিলেও বাকি অংশটুকু ভাঙ্গনের হুমকিতে রয়েছে। জরুরিভাবে নদী ভাঙ্গন রোধ করা না গেলে চর আবদানী গ্রামটি শুধু কাগজে-কলমে ইতিহাস হয়ে থাকবে।

চর আবদানী গ্রামের কৃষক মো. জালাল হাং বলেন, ‘আমি এই গ্রামে জন্ম নেয়ার পর থেকেই দেখতেছি কীর্তনখোলা নদী ভাঙ্গনের দৃশ্য। আমার আপন ভাইসহ পরিচিত অনেক মানুষের ঘর ও ফসলি জমি হারিয়ে গেছে নদীর ভাঙ্গনে। প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস ছিল এই গ্রামের আশ্রায় কেন্দ্র নিয়ে। কালের বিবর্তনে আর নদী ভাঙ্গলের কারণে হারিয়ে যায় ঘর-বাড়ি আর ফসলি জমি। বিভিন্ন জায়গায় চলে যায় গ্রামের অনেক পরিবার। যেহেতু আমি এই গ্রামের ছেলে, গ্রামের ভালবাসার টানে কোথাও যেতে পারি না। ভাঙণের সময় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘর উঠিয়ে কোনো রকমে থাকার জায়গা করতে হয়। আমার ঘর ও প্রায় পাঁচ একরের বেশি ফসিল জমি এখন নদীতে চলে গেছে, সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব আমি।’

চর আবদানীর গ্রামের অন্যতম সমাজসেবক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘এখন কীর্তনখোলার অব্যাহত ভাঙ্গনে ইতোমধ্যে চরবাড়িয়া ও চর আবদানীর এলাকা সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে কীর্তনখোলার ভাঙ্গনের কবলে রয়েছে ১৩১ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে বিদ্যালয়ের পাশে থাকা আয়নার প্যাদা জামে মসজিদসহ অসংখ্য স্থাপনা ও গ্রামবাসীর ফসলি জমি।’ 

কীর্তনখোলার ভাঙ্গন থেকে জরুরি ভিত্তিতে সরকারি-বেসরকারি এসব স্থাপনা ও গ্রামবাসীর ফসলি জমি রক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রী এবং পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেন এই গ্রামেবাসীরা। আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙ্গনে শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের কালিগঞ্জ, রাজাপুর ও আটহাজার নামের তিনটি গ্রাম বহু আগেই বিলীন হয়ে গেছে। এসব গ্রামের এখন আর কোনো অস্তিত পর্যন্ত নেই। মেহেন্দিগঞ্জের ভাষানচর, বাগরজা, শিন্নিরচর নদী ভাঙ্গনের কবলে মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। উলানিয়া গ্রামটি এখন মেঘনার ভাঙ্গনে বিলীন হওয়ার পথে। সেখানকার কালিরবাজার নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার পর এখন উলানিয়া মিয়া বাড়ি ও বড় বাজার হুমকির মুখে পড়েছে। উলানিয়ায় পরীক্ষামূলক ভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে প্রায় এক কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ করা হলেও উলানিয়াকে রক্ষায় তা কতোটা ভূমিকা রাখতে পারবে তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সূত্রমতে, মেঘনার কড়াল গ্রাসে উলানিয়ার অদূরবর্তী ভোলার বঙ্গেরচর, রাজাপুর, দৌলতখান, গুপ্তের বাজার, সৈয়দপুর, ভবানীপুর, এমনকি খোদ ভোলা শহরের নিকটবর্তী ধনিয়া, কাঁচিয়া এখন বিলীন হওয়ার পথে। ভোলা শহর থেকে মেঘনার দূরত্ব এখন মাত্র ৫ কিলোমিটার। ভোলা শহর রায় কাঁচিয়ায় একের পর এক বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও ভাঙ্গন প্রতিরোধে ব্যাক ফেলে মেঘনাকে শাসন করার চেষ্টা অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। নদী প্রতিশোধ নিতে, নাসির মাঝি এলাকায় ফনা তুলেছে। তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙ্গনে বোরহানউদ্দিনের কাঁচিয়া, পিয়া, হাকিমউদ্দিন ও পদ্মা মনসা গ্রাম পড়েছে ঝুঁকির মুখে। বোরহানউদ্দিনের শাহবাজপুরের গ্যাস ফিল্ডের কাছাকাছি চলে এসেছে নদীর ভাঙ্গন। ভোলা ও বরিশালের মধ্যবর্তী আলিমাবাদ ইউনিয়ন কালাবদর নদীর স্রোতে বিলীন হওয়ার পথে। পার্শ্ববর্তী চাঁদপুরা ইউনিয়নটি রয়েছে চরম হুমকির মুখে। মেঘনার ভাঙ্গনে পুরান হিজলা, চর মেমানিয়া, মৌলভীরহাট, গঙ্গাপুর, হরিনাথপুর, মলিকপুর, বাউশিয়া, বাহেরচর, হিজলা-গৌরবদী ও পালপাড়া গ্রামের কয়েক হাজার ঘরবাড়ি, ১০টি স্কুল এবং তিনটি হাটবাজার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। মুলাদীর জয়ন্তী ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙ্গনে উপজেলার নন্দিবাজার, চরলদিপুর, পাতারচর, বানিমদন, নাজিরপুর, মৃধারহাট, ছবিপুর, গুলিঘাট ও বাটামারা গ্রামের ২ হাজার বাড়িঘর, ৫টি বাজার ও ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। মুলাদী থেকে গৌরনদী যাতায়াতের সড়কটি বিলীন হয়ে যাওয়ার দীর্ঘ ১০ বছরেও তা সংস্কার করা হয়নি। সন্ধ্যা নদীর ভাঙ্গনে বানারীপাড়া-স্বরূপকাঠী সড়কটি ৬ বছরে আগে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। যদিও এখন সেখানে বিকল্প সড়ক তৈরী করা হয়েছে। বাবুগঞ্জের সুগন্ধা, আড়িয়াল খাঁ ও সন্ধ্যা নদীর ভাঙ্গনে রাজগুরু, লোহালিয়া, স্বরূপকাঠি, বাহেরচর, ঘোষকাঠি, মহিষাদি, রাকুদিয়া, ছানি কেদারপুর, মোলারহাট, রহিমগঞ্জ, রফিয়াদি গ্রামের কয়েক হাজার বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে উপজেলা সদর ও মীরগঞ্জ বাজার থেকে সুগন্ধা নদীর দূরত্ব মাত্র ১’শ গজ। উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের ৫টিই নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। চরম হুমকির মুখে রয়েছে শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর জাদুঘর। উজিরপুরে সন্ধ্যা ও সুগন্ধা নদীর ভাঙ্গনে বরাকোঠা ইউনিয়নের ৫টি গ্রাম ও শিকারপুরের ১০টি গ্রাম এবং গুঠিয়া ইউনিয়নের দাসেরহাট, কমলাপুর, সাকরাল, পরমানন্দ গ্রামের ২০ হাজার ঘরবাড়ি ও ৫টি স্কুল-মাদ্রাসা নদীতে বিলীন হয়েছে। ওই উপজেলার সাকরাল গ্রামটি সম্পূর্ণ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। শিকারপুর ও শেরেবাংলা ডিগ্রি কলেজ বর্তমানে সন্ধ্যা নদীর ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। সন্ধ্যা নদীর ভাঙ্গনে বানারীপাড়া উপজেলার কাজলাহাট, জম্বুদ্বীপ, ব্রানকাঠী, নাজিরপুর, শিয়ালকাঠী, মসজিদবাড়ির ১৫ হাজার ঘরবাড়ি, ৭টি স্কুল-মাদ্রাসা ও ২টি

বাজার ইতিপূর্বে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। শিয়ালকাঠী, দান্ডয়াট ও নলশ্রি গ্রাম এখন বিলীনের পথে। উজিরপুরের সাকরাল গ্রামের করিম সিকদারের পুত্র মিজান জানান, সে কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। এক রাতে তার ফসলের জমি বসত ঘর নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যায়। সে এখন শ্বশুর বাড়িতে বসবাস করে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে কোনো মতে দিন কাটাচ্ছেন। তার ভাই হাবিবুর রহমানেরও একই অবস্থা। ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের এলেই উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হয়। তাই বৃষ্টি সময় এলেই  ভাড়ি বর্ষণে রাখুসী নদীতে পানি বৃদ্ধি পেতে থাকায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ভারী বর্ষণে উজিরপুর-সাতলা সড়কটি এখন হুমকির মুখে। ইতোমধ্যে সাকরাল বহুমূখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনের অংশ ভেঙ্গে পড়েছে, পাশের মসজিদটি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে পড়েছে শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। গত বছর বরাকোঠা ইউনিয়নের প্রায় দেড় হাজার পরিবার নদী ভাঙ্গনে সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছেন। দীর্ঘদিনেও তাদের সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসেননি। ওই এলাকার চৌধুরীরহাট বাজারের প্রায় ৫০টি দোকান ঘর বিলীন হয়ে যাওয়ায় জমির অস্তিত সংকটে বাজারটি এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

দাসেরহাট, হক সাহেবের হাট, কমলাপুর, শিকারপুর এলাকার সহস্রাধিক পরিবার ভাঙ্গন আতঙ্কে রয়েছেন। আগৈলঝাড়ার পয়সারহাট নদীর ভাঙ্গনে খাজুরিয়া, বাগধা, চাত্রিশিরা, আমবৌলা ও সাতলা গ্রামের কয়েকশ ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। বর্তমানে পয়সারহাট নদীর ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। গৌরনদীর পালরদী নদীর ভাঙ্গনে উপজেলার হোসনাবাদ ও মিয়ারচর গ্রামের বাড়িঘর প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে। এখনো অসংখ্য বাড়িঘর, স্কুল ও বাজার ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। বাকেরগঞ্জের তুলাতলা, তান্ডব, খয়রাবাদ, বেবাজ, কাতিভাঙ্গা, রাঙ্গামাটি তুলাতলী নদীর ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। ওই নদীর কড়াল গ্রাসে এখন হুমকির মুখে রয়েছে কলসকাঠি, বোয়ালিয়া, বাখরকাঠি, নীলগঞ্জ, চরামদ্দি এলাকার কয়েক হাজার বাড়িঘর। মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনা, তেঁতুলিয়া, মাছকাটা, লতা ও আইরখালী নদীর ভাঙ্গনে উপজেলা সদর, গৌবিন্দপুর, উলানিয়া, চাঁনপুর, আলিমাবাদ, চর গোপালপুর, ভাষানচর, দরিররচর-খাজুরিয়া, চর একরিয়া এলাকার কয়েক হাজার বাড়িঘর, অর্ধশতাধিক স্কুলসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গোবিন্দপুরের ৯টি গ্রামের মধ্যে বর্তমানে মাত্র একটি গ্রাম রয়েছে। ওই একটি গ্রামকে পুনরায় ৯টি গ্রামে বিভক্ত করা হয়েছে। তাও ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। প্রতিবছর নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও নামেমাত্র কাজ করে সিংহভাগ টাকাই ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের পকেটে চলে যায় বলে ভাঙ্গন কবলিতরা অভিযোগ করেন। ভাঙ্গন প্রতিরোধে কখনোই কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

ভাঙ্গন কবলিত এলাকার মানুষেরা জানান, স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত যে পরিমাণ টাকা নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সে টাকায় ভাঙ্গন কবলিত গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষদের পুর্ণবাসন করা সম্ভব হতো। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে ২/১ কিলোমিটার দূরে গিয়ে নতুন কোনো বেড়িবাঁধে বসতি গড়ে ভাঙ্গন কবলিত মানুষেরা। কিন্তু দেখা যায় ২/১ বছরের মধ্যেই আবার সেখানেও নদী আঘাত হানে। এ যেন ছোঁয়াচে রোগের মতোই। এভাবে একের পর এক ভাঙ্গনের শিকার হয়ে অসহায় মানুষ গ্রাম ছেড়ে রুটি-রুজির সন্ধানে পাড়ি জমায় ঢাকা কিংবা বিভাগীয় কোনো বড় শহরে। কেউ রিকসা চালিয়ে কিংবা ঠেলাগাড়ি ঠেলে আবার গৃহবধূরা জীবিকার সন্ধানে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালায়। এক সময় যাদের গোয়াল ভরা গোরু, পুকুর ভরা মাছ আর শস্যে ভরা মাঠ ছিলো তারাই নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে এখন নগরজীবনে হতদরিদ্র মানুষের তালিকাভূক্ত হয়ে সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি হিসেব মতে সারাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে ৪০ শতাংশ মানুষ। অথচ নদী ভাঙ্গনের শিকার ও ঝড়-জলোচ্ছংসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়া বিভাগ বরিশালে দারিদ্র্যের হার ৫৩ ভাগ।  বর্ষা মৌসুম শুরু হতে  হলেই  বিরূপ আবহাওয়ার কারনে পানি বৃদ্ধি ও সাগরে নিম্নচাপের কারণে নদীর তীরবর্তী জনসাধারণের মাঝে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। নদী তীরের বাসিন্দারা জানান, পানি নামতে শুরু করলে ভাঙ্গন ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। আবারো শত-শত বাড়িঘর ও গ্রাম বিলীন হবে দক্ষিণের  উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৫টি নদীর কড়াল গ্রাসে। হিজলায় মানুষের স্থায়ী দুঃখ নদী ভাঙ্গন মেঘনা তীরের হিজলা অবহেলিত জনপদ। চারদিকে শুধু নদী আর নদী। নদী ও প্রকৃতির সাথে এখানের মানুষজন সুদীর্ঘকাল ধরে লড়াই করে আসছেন। হিজলার মানুষের স্থায়ী দুঃখ নদী ভাঙ্গন। নদী ভাঙ্গলে তারা কাঁদে, আবার এই নদীর মাছের ওপরই হিজলার প্রায় ৪০ ভাগ মানুষের বাঁচা-মরার সংগ্রাম। বিশেষ করে জেলেরা মেঘনায় ইলিশ মাছ পেলে তাদের আহার জোটে। জালে মাছ না পড়লে অনাহারেই তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করতে হয়। হিজলার মেঘনা তীরে প্রতি বছর গ্রামের পর গ্রাম, শিক্ষা  প্রতিষ্ঠান, বাজার, ফসলি জমি প্রমত্তা মেঘনার অতল তলে হারিয়ে যাচ্ছে। ঘরবাড়ি, গবাদী পশুসহ কোটি-কোটি টাকার সম্পদ হারিয়ে ভাঙ্গন কবলিত হাজার-হাজার মানুষেরা এখন সর্বস্বান্ত। ওই উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ আজও আশ্রয়হীন হয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। ভাঙ্গন কবলিত পরিবারগুলোর সহস্রাধিক মানুষদের আশ্রয় মিলেছে ভেরিবাঁধে। হিজলা উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন রাগুসী মেঘনা ও একটি ইউনিয়নকে নয়াভাঙ্গনী নদী ঘিরে রেখেছে। ইতোমধ্যে বড়জালিয়া, হিজলা গৌরবদী, হরিনাথপুর ও ধুলখোলা ইউনিয়নের একটি বড় অংশ নদীতে গিলে ফেলেছে। অন্যান্য এলাকাগুলোতেও আঘাত হেনেছে প্রমত্তা মেঘনা।

গত বছর হরিনাথপুর ইউনিয়নের টুমচর ও মহিষখালী গ্রাম নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে। এবছর জব্বার মেহমান কলেজ, বদর টুনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মহিষখালী মাদ্রাসা, পুলিশ ক্যাম্প ও পুরান হিজলা বাজার হুমকির মুখে রয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে নদী ভাঙ্গনের কারণে এসব এলাকার বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, হাজার-হাজার ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এখন পানির অতল তলে হারিয়ে গেছে। কয়েকবছর পূর্বে হিজলা থানাটিও ভাঙ্গনের মুখে পড়ায় তা অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। নদী ভাঙ্গনের মুখে পড়ে আশ্রয়হীন অসংখ্য পরিবার বরিশাল শহরের কাশিপুর, কাউনিয়া, সাগরদীসহ বিভিন্নস্থানে এবং বাকিদের একটা বড় অংশ ভোলার চরফ্যাশন ও বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপি নেতা মজিবর রহমান সরোয়ারের পিতা কাউনিয়ায়, মোঃ আলী হোসেন ও নজরুল ইসলাম মিলন কাশীপুরে আশ্রয় নিয়েছেন। রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি দেলোয়ার হোসেন তিনি আগে নদী ভাঙ্গনের কবলে পরে কাশীপুরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি রংপুরে স্থায়ী বসবাস করছেন।

পায়রা নদীতে ফের ভাঙ্গন শুরু, নতুন করে ফের পায়রা নদীর ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকশ একর কৃষি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। পৌর শহর রক্ষা বাঁধের ব্যাক সরে যাচ্ছে। বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে পৌরসভাসহ বরগুনার আমতলী-তালতলী উপজেলার ২০টি গ্রাম। নতুন করে ভাঙ্গন শুরু হওয়ায় আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ভাঙ্গন কবলিত এলাকার মানুষেরা। পায়রা নদীর তীব্র ভাঙ্গনে ক্রমেই পাল্টে যাচ্ছে আমতলী ও তালতলীর মানচিত্র।

সূত্রমতে, ১৯৯০ সালে আমতলী ও তালতলী উপজেলায় পায়রা নদীর ভাঙ্গন শুরু হয়। এ পর্যন্ত ভাঙ্গনের ফলে পৌরসভার পুরাতন শ্মশান ঘাট, লঞ্চ ঘাট, ফেরিঘাট, বালিয়াতলী, পশুরবুনিয়া, পশ্চিম ঘটখালী, আঙ্গুগুলকাটা, গুলিশাখালী, জয়ালভাঙ্গা, বগীরবাজার, মৌপাড়া, গাবতলী, তেঁতুলবাড়িয়া ও তালুকদারপাড়াসহ ২০টি গ্রামের অর্ধেক অংশ নদী গ্রাস করে নিয়েছে। অন্যদিকে পাউবোর ভেড়ি বাঁধ ভেঙ্গে লবণ পানি ঢুকে কোটি-কোটি টাকার ফসলি জমি ধ্বংস করছে। সূত্রে আরো জানা গেছে, ১৯৯৮ সালে আমতলী পৌরসভাকে ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষায় ১ কিলোমিটারের দৈর্ঘের সিসি ব্যাক ফেলা হয়। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলাতে রক্ষা বাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ২০১০ সালে মাত্র ১২৫ মিটার ক্ষতিগ্রস্ত অংশের ব্যাক ফেলা হয়। ওই কাজ অতি নিম্নমানের হওয়ায় পুনঃরায় ব্যাক সরে যাচ্ছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে পাউবোর অফিস সংলগ্ন পায়রা নদীতে ভয়াবহ ভাঙ্গনের কারণে ৫০/৬০ মিটার  ব্যাক সরে গেছে।

বর্তমানে ফেরিঘাট, পুরাতন লঞ্চঘাট, পশ্চিম ঘটখালী, আঙুলকাটা এলাকা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গত ২৩ বছরে আমতলী ও তালতলী উপজেলায় ৪ হাজার ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ৮শ একর কৃষি জমি ও ২৫ কিলোমিটার ভেড়িবাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের নদী ভাঙ্গণরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানানো হয়েছে, ভাঙ্গন প্রতিরোধে ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ শুরু করা হবে।